আমরা আগেই বলেছি, ধর্মীয় অনুভূতি মানুষের জন্মগত বা সহজাত অনুভূতি। একে নির্মূল করা যায় না এবং নির্মূলের প্রচেষ্টা বুমেরাং হয়। একে সঠিক ও স্বাভাবিক খাতে প্রবাহিত না করতে পারলে তা কখনো কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা বা অনৈতিকতার জন্ম দেয় এবং কখনো উগ্রতার জন্ম দেয়। এগুলির অপসারণ বা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রেক্ষাপটগুলি অনুধাবন প্রয়োজন। আমরা দেখেছি যে, বিশ্বব্যপী মুসলিম নিধন, প্রতিকারের সকল পথ রুদ্ধ হওয়া, হতাশা ও পরিবর্তনের আবেগ অনেক মুসলিমকে উগ্রতার পথ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করছে। কখনো বা মুমিন পারিপার্শিক অত্যাচার বা নিধনযজ্ঞের প্রতিকার করার কোনো পথ না পেয়ে উগ্র হয়ে পড়েন এবং উগ্রতার পক্ষে কিছু ‘‘দলিল-প্রমাণ’’ খুঁজে নেন। কখনো বা একজন মুসলিম নিজের আবেগে পড়াশোনা করতে যেয়ে এরূপ ব্যাখ্যা ও উগ্রতার মধ্যে নিপতিত হন। এরপর তিনি হয়ত অন্যদেরকেও প্রভাবিত করেন। কখনো বা অন্যের মুখে এরূপ ব্যাখ্যা শুনে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। কখনো বা কোনো ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত বা দলগত স্বার্থ অর্জন করতে
ইসলামী শিক্ষার বিকৃত উপস্থাপনের মাধ্যমে এরূপ উগ্রতার প্রসার ঘটাতে চেষ্টা করেন।

এছাড়া আমরা জানি যে,, ইহূদী ও খৃস্টান পন্ডিতগণও কুরআন ও হাদীস ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছেন। তাদের পক্ষেও কুরআনের কিছু আয়াত, কিছু হাদীস বা কিছু ফিকহী মতামত বিকৃৃতভাবে উপস্থাপন করে অজ্ঞ আবেগী যুবকদেরকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব। আমরা দেখেছি যে, মুসলিম দেশগুলিকে অশান্ত করে তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক প্রবৃদ্ধি থামিয়ে দেওয়া, সভ্যতার সংঘাতের থিওরির সত্যতা প্রমাণ করা, ‘‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’’ বা জঙ্গিবাদ দমনের নামে মুসলিম দেশগুলিকে দখল করা বা অধীনত রাখা, জঙ্গিবাদ দমনের নামে মুসলিম দেশগুলিতে ইসলামী মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন ও ইসলামী শিক্ষা সংকোচন করা, ধার্মিক মুসলিম ও আলিমগণের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করা ইত্যাদি বহুবিধ উদ্দেশ্যে ইহূদী-খৃস্টান ও ইসলামবিদ্বেষী পন্ডিতগণ বা সংস্থা ইসলামের ছদ্মাবরণে এরূপ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। ইসলামী শিক্ষার এ ধরনের বিকৃতি রোধে বিকৃতি সংশি­ষ্ট সকল বিষয়ে কুরআন, হাদীস, সাহাবীগণ ও তাঁদের পরের সকল যুগের আলিমগণের মতামত ও কর্মধারার আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সমকালীন আলিম-উলামা, পীর-মাশাইখ, গবেষক ও সমাজসেবকদের সামষ্টিক চেষ্টা প্রয়োজন।

এখানে লক্ষণীয় যে, বিকৃতি সংশি­ষ্ট বিষয়গুলি আধুনিক। এ সকল বিষয়ে কুরআন, হাদীস ও পূর্ববর্তী আলিমগণের সুস্পষ্ট বা দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা ও মতামত না পাওয়াই স্বাভাবিক। যেমন, উপনিবেশোত্তর মুসলিম দেশগুলির বিধান, সমকালীন প্রেক্ষাপটে দারুল ইসলাম বা ইসলামী রাষ্ট্রের পরিচয়, ধর্মরিনপেক্ষ অমুসলিম দেশগুলির বিধান, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্যবাদ, জাতীয়তাবাদ, পার্লামেন্ট, সার্বভৌমত্ব, ভোট ব্যবস্থা, এগুলিতে অংশ গ্রহণ বা বর্জন, সমকালীন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের নেতৃত্বে জিহাদের বিধান, বিদেশী আগ্রাসনের শিকার মুসলিম দেশগুলির আগ্রাসন বিরোধী আন্দোলনের বিধান, এরূপ ক্ষেত্রে সশস্ত্র প্রতিরোধের বিধান ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক সমাধান দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। এ সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মতভেদ বা ভুল সিদ্ধান্ত অনেক মানুষকে কঠিন পাপের মধ্যে নিপতিত করতে পারে এবং উম্মাতের জন্য ধ্বংসাত্মক হতে পারে।

আমরা লক্ষ্য করি যে, এ সকল বিষয়ে সমাজের প্রাজ্ঞ ও সুপ্রসিদ্ধ পীর-মাশাইখ, আলিম ও মুফতীগণের মতামত কম পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে ‘‘চিন্তাবিদ’’ ও ‘‘আবেগী মুজাহিদগণ’’ এ সকল বিষয়ে ঝটপট অনেক সুস্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেন। অনেকেই গতানুগতিক বা ‘ট্রেডিশনাল’ আলিম ও বুজুর্গদের দুর্বলতা বা অজ্ঞতাকে এর কারণ হিসেবে মনে করেন। অনেকে মনে করেন সমাজের সব অন্যায় মেনে নেওয়ার মানসিকতাই এর জন্য দায়ী। এরূপ মত নিঃসন্দেহে অজ্ঞতা ও আবেগপ্রসূত জুলম। বিগত দেড় হাজার বৎসর দীনের ঝান্ডাকে ধরে রেখেছেন আলিমগণ। তাঁদেরই মাধ্যমে আমরা দীন পেয়েছি। সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁরা সোচ্চার থেকেছেন। তবে সোচ্চার হওয়ার পদ্ধতিতে বিভিন্নতা ছিল। বস্ত্তত এ সকল আধুনিক বিষয়ে ‘‘ট্রেডিশনাল’’ আলিম ও মুফতীগণের সুস্পষ্ট মতামত না থাকার কারণ আধুনিক হওয়াতে এগুলির বিষয়ে কুরআন-হাদীস ও পূর্ববর্তী আলিমগণের সুস্পষ্ট মতামত পাওয়া যায় না। আর প্রাজ্ঞ আলিমগণ এরূপ সুস্পষ্ট মতামতের বাইরে ঝটপট কোনো সিদ্ধান্ত দিতে দ্বিধা করেন। পক্ষান্তরে একজন ‘‘চিন্তাবিদ’’ বা ‘‘আবেগী’’ মানুষ সাধারণত কুরআন হাদীসের দু একটি সাধারণ বক্তব্যকেই তার মত প্রকাশের জন্য যথেষ্ঠ বলে গণ্য করেন; কাজেই সাহাবী-তাবিয়ীগণের মতামত বা পূর্ববর্তী ফকীহগণের মতামতের জন্য তিনি অপেক্ষা করেন না। এমনকি আয়াত বা হাদীসটি কতখানি প্রাসঙ্গিক বা তার বিপরীতে অন্য কোনো আয়াত বা হাদীস রয়েছে কিনা তাও তত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন না। আলিমগণের মতামত ধীর হলেও তাতে ভুলের সম্ভাবনা কম থাকে। আর চিন্তাবিদ বা আবেগী মানুষের মতামত খুবই দ্রুত ও সুস্পষ্ট হলেও তাদের ভুলের সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি।এছাড়া আমরা সমাজ সংস্কারে পূর্ববতী আলিম-উলামা ও পীর-মাশাইখের কর্মপদ্ধতি পর্যালোচনা করলে দেখব যে, তাঁরা সর্বদা বিনম্রতা, ওয়ায-নসীহত ও জনমত তৈরির মাধ্যমে তা করতে চেষ্টা করেছেন, কখনোই দ্রুত ফল লাভের জন্য ব্যস্ত হন নি। তাদের কর্মধারার আলোকেই সমকালীন প্রসিদ্ধ আলিমগণ মতামত ব্যক্ত করেন। দ্রুত ফললাভে আগ্রহী আবেগী মানুষদের কাছে মনে হয়, এরূপ মতামত ‘‘সবকিছু মেনে নেওয়ার’’ শামিল। এভাবে কি আর কিছু পরিবর্তন করা যাবে? এদের কাছে চিন্তাবিদ ও আবেগী তরুণ মুফতীদের মতামত বেশি পছন্দনীয় বলে মনে হয়।

সকল আবেগ ও চাপের বাইরে থেকে কুরআন, হাদীস, সাহাবীগণের ও তৎপরবর্তী যুগের আলিমগণের কর্মধারার ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে এ সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। দ্রুত ফললাভ, প্রতিশোধ বা অন্য কোনো আবেগের অধীনে অথবা দেশ, দল, গোষ্ঠী বা কারো চাপের অধীনে কুরআন হাদীসের একপেশে সিদ্ধান্ত নিলে তা সঠিক হবে না এবং সংশি­ষ্ট মানুষদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। উপরন্তু সিদ্ধান্ত ও মতামত প্রাসঙ্গিক তথ্যসমৃদ্ধ হতে হবে। এ ছাড়া যে সকল আয়াত ও হাদীসকে বিকৃতির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় সেগুলির বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বর্তমান যুগে এককভাবে গ্রহণযোগ্য আলিম যেমন দুর্লভ, তেমনি এ সকল বিষয়ে এককভাবে ইজতিহাদ করার মত যোগ্যতাসম্পন্ন আলিমও দুর্লভ। এজন্য এ সকল বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আলিম ও ইসলামী চিন্তাবিদগণের মতবিনিময় ও সমবেত ইজতিহাদ প্রয়োজন। সমাজের গতানুগতিক অনেক বিষয়ের পাশাপাশি এ সকল বিষয়ে প্রাজ্ঞ আলিমগণের মতপ্রকাশ খুবই জরুরী। উম্মাতের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা ও দরদ নিয়ে আলিমগণকে একত্রে বসে মতবিনিময়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে। সমবেত মতবিনিময়ে নিজের মত, অভিরুচী, প্রয়োজন ও স্বার্থের ঊধ্বে উম্মাতের বৃহত্তর কল্যাণে পূর্ববর্তী ইমাম ও আলিমগণের কর্মধারার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রথম চার প্রজন্মের এবং বিশেষ করে তিন প্রজন্মের নির্ভরযোগ্যতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। এরা হলেন সাহাবীগণ, তাঁদের ছাত্রগণ (তাবিয়ীগণ), তাঁদের ছাত্রগণ (তাবি-তাবিয়ীগণ) ও তাদের ছাত্রগণ (আতবা আতবায়িত তাবিয়ীন)। দীনের সকল বিষয়ে, বিশেষত মতভেদীয় ও জটিল বিষয়ে এ তিন ও চার প্রজন্মের আলিম, ফকীহ, ইমাম ও বুজুর্গগণের মতামতের ও কর্মধারার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অতীব প্রয়োজন।

৩. ১. বিভ্রান্তির সমকালীন প্রেক্ষাপট

খারিজী ও বাতিনীগণ কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করলেও সাধারণ মানুষদের মধ্যে তাদের বিভ্রান্তি প্রভাব ফেলতে পারে নি। কিন্তু বর্তমানে একদিকে বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিধন, মুসলিম দেশগুলিতে ধার্মিক মানুষদের প্রতি বৈষম্য, হয়রানি ও জুলুম, ইসলামী অনুশাসন বিষয়ক দাবিদাওয়াকে গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে দমন করার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে তেমনি ইসলাম সম্পর্কে আবেগ ও ভালবাসার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের ব্যবহারিক সুন্নাত সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে তাদের উগ্র মতামত সমাজের অনেক ধার্মিক মানুষকে প্রভাবিত করছে। নিঃসন্দেহে কুরআন ও হাদীস ইসলামী জ্ঞানের মূল উৎস এবং প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব নিজে কুরআন ও হাদীস অধ্যয়ন করে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা। সকল মুসলিম কুরআন-হাদীস অধ্যয়ন করবেন, কিন্তু সকল মুসলিমই বিশেষজ্ঞ হবেন না।

আরবী ভাষার গভীর জ্ঞান, কুরআনের পরিপূর্ণ অধ্যয়ন, বিশাল হাদীস ভান্ডারের সকল হাদীস অধ্যয়ন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীগণের কর্ম, চিন্তা, মতামত ও কুরআন-হাদীস ব্যাখ্যার প্রক্রিয়া অধ্যয়ন ও সমস্যা সমাধানে সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবিতাবিয়ীগণের মতামত ও কর্মধারা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানলাভের পরেই একজন মানুষ প্রকৃত আলিম ও ফকীহ বলে গণ্য হন এবং ব্যক্তিগত, সামাজিক বা রাষ্ট্রিয় সমস্যার ক্ষেত্রে ইসলামী ‘ফাতওয়া’ বা সিদ্ধান্তদানের যোগ্যতা অর্জন করেন। স্বভাবতই এরূপ আলিমদের সংখ্যা সমাজে কম থাকে। এজন্য মুসলিম উম্মাহর আলিমগণের রীতি হলো, জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে সমকালীন প্রাজ্ঞ আলিমগণের মতামত গ্রহণের পাশাপাশি পূর্ববর্তী প্রখ্যাত আলিম, ফকীহ ও ইমামদের মতামতের অনুসন্ধান ও তাদের মতামতের আলোকে সিদ্ধান্ত প্রদান। এক্ষেত্রে তাঁরা কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনার আলোকে সাহাবীগণ ও তাঁদের পরবর্তী দুই প্রজন্মের আলিমদের মতামতের বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন।

এ মূলনীতি লঙ্ঘন করার কারণেই এ সকল উগ্র মতের জন্ম হয়। প্রাচীন ও নব্য খারিজীগণ সাহাবীগণের এবং তাঁদের পরে সমাজের মূলধারার আলিমগণের মতামত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। নিজেদের মতামতকেই তারা চূড়ান্ত বলে মনে করেছে। তবে তারা এরূপ মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির বিশেষ ক্ষমতা বা আল্লাহর সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক, কাশফ, ইলহাম, গোপন জ্ঞান ইত্যাদির কোনো দাবি করে নি। বাতিনীগণ ও শীয়াগণও সর্বদা সাহাবী, তাবিয়ী ও সমাজের মূলধারার মুসলিম আলিমগণকে অবজ্ঞা ও ঘৃণা করেছে এবং কুরআন বা ইসলাম সম্পর্কে নিজেদের ‘‘বুঝ’’ই চূড়ান্ত বলে মনে করেছে। পাশাপাশি তারা বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ গোপন জ্ঞান, কাশফ, ইলহাম, ইলকা, ইলম-লাদুন্নী, আল্লাহর সাথে বিশেষ সম্পর্ক বা বিশেষ ‘পদাধিকার’ দাবি করেছে। ফলে এ সকল কল্পিত নেতা বা নেতাদের নামে অন্য কেউ তাদের কঠিন বিভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত করেছে। উভয় পদ্ধতিতেই তাদের মধ্যে ধার্মিকতা, ধর্মপালন ও ধর্মজ্ঞান সম্পর্কে অপ্রতিরোধ্য ‘অহঙ্কার’ সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে তারা ইসলাম সম্পর্কে তাদের বা তাদের নেতৃবৃন্দের ব্যাখ্যা বা মতকেই চূড়ান্ত সত্য বলে গ্রহণ করে বিভ্রান্তির মধ্যে নিপতিত হয়েছে। বর্তমানে সঠিক ইসলামী শিক্ষার অনুপস্থিতি, বিশেষত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাদির বিষয়ে সঠিক ধারণার অনুপস্থিতিতে আবেগতাড়িত ধ্যানধারণার প্রসারের বিশেষ প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে:

(ক) গত প্রায় অর্ধ-সহস্র বৎসর যাবৎ মুসলিম উম্মাহর সকল দেশেই ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক মানগত অবনতি ঘটেছে। বিশেষত উপনিবেশাধীন সমাজে এবং এর পরে ‘ইসলামী শিক্ষার’ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাদ্রাসগুলির শিক্ষার মান কমেছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমর্থনের অভাব, মেধাবী শিক্ষার্থীর অভাব, গবেষণা উপকরণ ও পরিবেশের অভাব ইত্যাদি কারণে এ সকল প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া অধিকাংশেরই ইসলামী জ্ঞানের গভীরতা কম। সমাজ ও রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক সমর্থন ও মূল্যায়নের অভাবে গবেষণার সুযোগ থেকে তাঁরা বঞ্চিত। পূর্ববর্তী আলিমগণ যে সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন সেগুলি পাঠ ও মুখস্থ করা হলেও, আধুনিক সমস্যাবলিতে ইজতিহাদ ও সমাধান দেওয়ার যোগ্যতা গড়ে তোলার মত কোনো পরিবেশ বা ব্যবস্থা এ সকল প্রতিষ্ঠানে নেই বললেই চলে।

(খ) এ সকল ট্রেডিশনাল আলিমের পাশাপাশি বর্তমান যুগে আরেক শ্রেণীর ইসলামী চিন্তাবিদ রয়েছেন। এরা হচ্ছেন সে সকল ‘সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রাপ্ত’ শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা সাধারণ মানুষ জীবনের মাঝপথে এসে ধর্ম বিমুখতা থেকে ধার্মিকতার দিকে ফিরে আসেন। এ পর্যায়ে তাঁরা কুরআন, হাদীস ও ইসলামের ইতিহাস চর্চা শুরু করেন। এরা মূলত মেধাবী। এক সময়ে এদের অনেকে তাঁদের মেধা, মনন ও বুদ্ধি দিয়ে কুরআন-হাদীসের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও ‘ফাতওয়া’ দিতে শুরু করেন। স্বভাবতই তাঁরা বিশাল হাদীস ভান্ডার, সাহাবীগণের কর্মপদ্ধতি ও পূর্ববর্তী আলিমগণের মতামত কিছুই জানেন না বা জানার গুরুত্বও অনুভব করেন না। এ সকল চিন্তাবিদদের মধ্যে যারা আরব তারা সমকালীন আরবী ভাষা জানলেও কুরআন, হাদীস ও ইসলামী ফিকহের পরিভাষার সাথে ততটা পরিচিত নন। বিশেষ করে তাফসীর, হাদীস, ও ফিকহের বিশাল ভান্ডার তাদের কাছে একেবারেই অপরিচিত। আর এদের মধ্যে যারা অনারব তাদের অবস্থা আরো শোচনীয়। কুরআন-হাদীস বুঝার ক্ষেত্রে তাঁরা মূলত অনুবাদ বা অনুবাদকের ‘‘বুঝ’-এর উপরেই নির্ভর করেন। তাঁদের জানা কুরআনের আয়াত এবং সীমিত কিছু হাদীসের শাব্দিক অর্থের সাথে নিজেদের জ্ঞান, বুদ্ধি ও মননশীলতার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তাঁরা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করতে থাকেন। তাঁদের বাগ্মিতা, আধুনিক জগত ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁদের গভীর জ্ঞান সাধারণ মুসলিমদেরকে আকৃষ্ট করে। আধুনিক বিষয়াদি সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান ও পান্ডিত্য অনেক হলেও আরবী ভাষা, কুরআন, হাদীস, সাহাবীগণের কর্মধারা ও প্রাচীন ইমামগণের মতামতের বিষয়ে তাঁদের জ্ঞানের দৈন্যতা সুস্পষ্ট।

(গ) অধিকাংশ ক্ষেত্রে উভয় শ্রেণীর আলিম ও গবেষক একে অপরকে ভাল চোখে দেখেন না। এছাড়া সাধারণভাবে আলিমউলামা ও গবেষকদের মধ্যে মতবিনিময়, গবেষণা, আলোচনা ইত্যাদির সুযোগ ও আগ্রহ নেই বললেই চলে। ফলে আধুনিক রাষ্টব্যবস্থা, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, নির্বাচন, উপনিবেশোত্তর মুসলিম দেশগুলির ইসলামী অবস্থান, এগুলিতে পরিপূর্ণ ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি, এ সকল রাষ্ট্রের প্রতি মুসলিম নাগরিকের সম্পর্ক, রাষ্ট্র বা সরকারের দীন বিরোধী কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা ও ইসলামী সমাধান প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। প্রত্যেকেই কুরআন ও হাদীস থেকে অল্প বা বেশি উদ্ধৃতি প্রদান করে একটি মত প্রকাশ করছেন। প্রায় সকল ক্ষেত্রে দলিল প্রদান প্রক্রিয়া খারিজীগণের মত হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ কিছু আয়াত ও হাদীসের আলোকে মতামত প্রকাশ করা হলেও, যে বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে, অনুরূপ কোনো বিষয় বা অবস্থা রাসূলুল্লাহ (ﷺ), সাহাবীগণ বা তাবিয়ীগণের সময়ে ছিল কিনা এবং সেক্ষেত্রে তারা কি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সেগুলি বিবেচনা করা হচ্ছে না। এভাবে ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন বিকৃত ধারণা জন্ম নিচ্ছে, যা ইসলামের নামে উগ্রতা সৃষ্টিতে সহায়তা করছে।

(ঘ) উপরের বিষয়গুলির পাশাপাশি রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজের অনাচার, পাপ, দুর্নীতি, নগ্নতা, অশ্লীলতা, জুলুম-অত্যাচার ইত্যাদির ক্ষেত্রে অনেক আলিমের নীরবতা ও আলিম-উলামা ও পীর-মাশাইখের পারস্পারিক মতভেদ, দলাদলি ও গালাগালি সমাজের আবেগী যুবকদের হতাশ ও বিক্ষুদ্ধ করে তোলে। এ অবস্থায় উগ্রতার আহবানকারীদের নিষ্ঠা, সততা ও নির্ভীকতা তাদেরকে আকৃষ্ট করে। খারিজীগণ, বাতিনী শিয়াগণ ও জামা‘আতুল মুসলিমীন-এর বিভ্রান্তিআমরা কুরআন কারীম, সুন্নাতে নববী, সাহাবায়ে কেরামের কর্মপদ্ধতি এবং পূর্ববর্তী ইমাম, আলিম ও পীব-মাশাইখের কর্মধারার আলোকে পর্যালোচনা করতে চাই। কারণ ইসলামের নামে উগ্রতায় লিপ্ত মানুষদের তাত্ত্বিক বিভ্রান্তিগুলি প্রায় সবই একই প্রকৃতির। আমরা আল্লাহর তাওফীক প্রার্থনা করছি।
পূর্বোক্ত বিভ্রান্ত গোষ্ঠীগুলির মতামত ও দাবি-দাওয়া পর্যালোচনা করলে আমরা কয়েকটি বিষয় দেখতে পাই:

(১) নিজের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেয়ে অন্যের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া
(২) করণীয় ও বর্জনীয়ের মধ্যে পার্থক্য না বুঝা
(৩) ইসলামী শিক্ষার বিকৃত অনুধাবন ও উপস্থাপন।

৩. ২. নিজের জীবনে ইসলাম বনাম অন্যের জীবনে ইসলাম

ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে উগ্রতার পিছনে অন্যতম যে বিষয়টি দেখা যায় তা হলো, নিজের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেযে অন্যের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা। এটি আবেগপ্রসূত বিভ্রান্তিগুলির অন্যতম। দ্বীন প্রতিষ্ঠার দুটি পর্যায় রয়েছে: (১) নিজের জীবনে দীন প্রতিষ্ঠা করা এবং (২) অন্যের জীবনে তা প্রতিষ্ঠা করা। মুমিনের মূল দায়িত্ব নিজের জীবনে ও নিজের দায়িত্বাধীনদের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। ইসলামে নিজের জীবনে পালনীয় ইবাদতগুলিকে আরকানে ইসলাম, ফরয আইন বা সুন্নাত আইন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পক্ষান্তরে দাওয়াত, আদেশ, নিষেধ, জিহাদ ইত্যাদি ‘‘অন্যের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার’’ দায়িত্ব বিষয়ক ইবাদতগুলিকে মূলত ‘ফরয কিফায়া’ বা সামষ্টিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং সুযোগ ও সাধ্যের আলোকে কম বেশি পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সর্বোপরি এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির দায়িত্ব দাওয়াত দেওয়া। কেউ বা সকলে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলে বা অন্যায় পরিত্যাগ না করলে মুমিনের কোনোরূপ দায়বদ্ধতা থাকে না। কিন্তু উগ্রতায় লিপ্ত মানুষদেরকে আমরা এর উল্টো পথে চলতে দেখি। তারা মূলত ‘‘অন্যের জীবনে দীন প্রতিষ্ঠাকে’’ ফরয আইন ও বড় ফরয এবং নিজের জীবনে দীন পালনকে ‘‘ছোট ফরয’’ বা গুরুত্বহীন বলে মনে করেন। তারা অন্যের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তিগতভাবে হারাম-মাকরূহ কর্মে লিপ্ত হচ্ছেন এবং এরূপ হারাম-মাকরূহ কর্মে লিপ্ত হওয়াকে নানাভাবে বৈধ, বরং জরুরী বা ফরয বলে দাবি করছেন।

তাদের মনের একই চিন্তা, সমাজে বা দু&&নয়ায় অমুক অন্যায় হচ্ছে, আল্লাহর আইনের বিরোধিতা হচ্ছে, আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করা হচ্ছে, কিভাবে নীরব থাকবে মুমিন। কাজেই যেভাবে পার ঝাপিয়ে পড়ে সব অন্যায় মিটিয়ে দিয়ে বিশ্বের সর্বত্র সকলের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা কর। বস্ত্তত এরূপ চিন্তা ভাল চিন্তার সাথে খারাপ চিন্তার সমন্বয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ মুমিনের মনে অবশ্যই থাকবে এবং মুমিন সাধ্যমত ইসলাম নির্দেশিত পথে তা প্রতিকারের চেষ্টা করবে বা দাওয়াত দিবে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, মহান আল্লাহ মুমিনকে তাঁর নিজের ও নিজের দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাস করবেন, দুনিয়ার অন্য মানুষদের পাচাচার সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করবেন না। সাধ্যমত দাওয়াতের পরেও যদি মানুষ তা গ্রহণ না করে সে জন্য মুমিনের কোনোরূপ অপরাধ থাকে না। মহান আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنْفُسَكُمْ لَا يَضُرُّكُمْ مَنْ ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ

‘‘হে মুমিনগণ, তোমাদের উপরে শুধু তোমাদের নিজেদেরই দায়িত্ব। তোমরা যদি সৎপথে পরিচালিত হও তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের কোনো ক্ষতি করবে না।’’[1] বস্ত্তত সমাজ, রাষ্ট্রে ও বিশ্বে অন্যায়, পাপ ও অপরাধ থাকবেই, কখনো বেশি এবং কখনো কম। মুমিনের দায়িত্ব দাওয়াত দেওয়া, মুমিনের দায়িত্ব হিদায়াত করে ফেলা বা ভাল করে ফেলা নয়। মহান আল্লাহ তার মহান রাসূল (ﷺ)-কে বলেন:

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ

‘‘তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন।’’[2]
আল্লাহ আরো বলেন:

وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ

‘‘আর তুমি যতই চাও না কেন, অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাসী হবার নয়।’’[3]
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:

وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَآمَنَ مَنْ فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا أَفَأَنْتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّىٰ يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ

‘‘তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সকলেই ঈমান আনত; তবে কি তুমি মুমিন হওয়ার জন্য মানুষদের উপর জবরদস্তি করবে?’’[4] অনেক সময় আবেগী মুমিন সমাজের পাপাচারে বেদনাগ্রস্ত হয়ে দ্রুত সবকিছু ঠিক করে ফেলতে আগ্রহী হন। তিনি কুরআনসুন্নাহর নির্দেশ ও মানবজাতির পরিচালনায় আল্লাহর সুন্নাতের কথা ভুলে যান। দ্রুত ফলাফল লাভের জন্য ব্যস্ত হয়ে যান। তিনি ভাবেন: ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে বা ইসলামের বিজয় আনতে হবে। অমুক বা তমুক পদ্ধতিতে তা আসবে না, বরং আমাদের এ পদ্ধতিতেই এ বিজয় দ্রুত হাতের মুঠোয় এসে যাবে। অমুক পদ্ধতিতে শত বৎসর বা হাজার বৎসর কাজ করলেও ইসলামের বিজয় আসবে না, কিন্তু আমাদের পদ্ধতিতে কাজ করলে অল্প সময়েই তা এসে যাবে। মনে হয় কে কত তাড়াতাড়ি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পারল এর উপরেই আল্লাহ নবী-রাসূল ও মুসলমানদের হিসাব নিবেন!!

ফলাফল লাভের উন্মাদনা আবেগী মুমিনকে বিপথগামী করে। মুমিন চায় যে, সমাজ থেকে ইসলাম বিরোধী ও মানবতা বিরোধী সকল অন্যায় ও পাপ দূরীভুত হোক। কোনো মুমিনের মনে হতে পারে যে, এত ওয়ায, বক্তৃতা, বইপত্র, আদেশ নিষেধ ইত্যাদিতে কিছুই হলো না, কাজেই মেরেধরে জোরকরে সব অন্যায় দূর করে ফেলতে হবে। তখন তিনি দাওয়াতের শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি ও শরীয়ত নিষিদ্ধ পদ্ধতির মধ্যে বাছবিচার না করে ফলাফলের উন্মাদনায় শরীয়ত নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ করতে চেষ্টা করেন।

এ জাতীয় চিন্তভাবনা সবই কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষার সাথে সাংঘষিক। মুমিনের দায়িত্ব নিজের জীবনে দীন প্রতিষ্ঠা ও দীনের দাওয়াত। দাওয়াতের দ্রুত ফলাফলের চিন্তা তো দূরের কথা, কোনো ফলাফলের চিন্তাই মুমিনের দায়িত্ব নয়। অগণিত নবী-রাসূল আজীবন দাওয়াত দিয়েছেন, কিন্তু অতি অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ তাদের দাওয়াত গ্রহণ করেছেন। এতে তাঁদের ‘‘দীন প্রতিষ্ঠার’’ বা ‘‘দাওয়াতের’’ দায়িত্ব পালনের কোনো ঘাটতি হয় নি।

পরবর্তী আলোচনা থেকে আমরা দেখব যে, ‘‘দ্রুত সকল অন্যায় মিটিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার’’ জন্য উদগ্রীব মানুষেরা কখনই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নি, বরং সুন্নাত পদ্ধতিতে ন্যায়ের আদেশ, অন্যায়ের নিষেধ বা দাওয়াত ও দীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সমাজ সংস্কারের কর্ম সম্পাদিত হয়েছে। কাজেই মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের জীবন দীন পালনের পাশাপাশি কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত পন্থায় দীনের দাওয়াত দেওয়া। দাওয়াতের দায়িত্ব দুভাবে আঞ্জাম দেওয়া হয়: (১) অরাষ্ট্রীয়, অর্থাৎ ব্যক্তিগত, দলগত বা গোষ্ঠীগতভাবে এবং (২) রাষ্ট্রীয়ভাবে। অরাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠার একটিমাত্রই মাধ্যম, তা হলো ‘দাওয়াত’ বা সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দাওয়াতের পাশাপাশি আরো দুটি মাধ্যম রয়েছে: (ক) আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও (খ) প্রয়োজনে শত্রুরাষ্ট্রের কবল থেকে দীন, রাষ্ট্র, জনগণ, দুর্বল মুসলিম বা অমুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিহাদ বা কিতাল অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ করা। সকল পর্যায়ে ও ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশ হলো সহিংসতা ও সীমালঙ্ঘন বর্জন করা। শুধু সহিংসতা বর্জনই নয়, দাওয়াত, প্রচার, সৎকাজে আদেশ, অন্যায় থেকে নিষেধ ইত্যাদি ‘দ্বীন প্রতিষ্ঠার’ সকল কর্মে ‘অহিংসতা’ দ্বারা ‘সহিংসতা’-র প্রতিরোধ করতে এবং সহিংসতার প্রতিবাদে ‘উত্তম’ আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ

‘‘কথায় কে উত্তম ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা, যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি
আত্মসমর্পনকারীদের অন্তর্ভুক্ত। ভাল এবং মন্দ সমান হতে পারে না। (মন্দ) প্রতিহত কর উৎকৃষ্টতর (আচরণ) দ্বারা; ফলে তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত।’’[5]
অন্যত্র ইরশাদ করা হয়েছে:

ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ السَّيِّئَةَ ۚ نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَصِفُونَ

‘‘মন্দের মুকাবিলা করুন যা উৎকৃষ্টতর তা দিয়ে, তারা যা বলে আমি সে সম্পর্কে বিশেষ অবহিত।’’[6]
বর্তমান বিশ্বে ইসলামী দা‘ওয়াত বা ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্ঠা অনেক সময় ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রতিরোধ, অত্যাচার বা সহিংস আচরণের সম্মুখীন হয়। এতে দা‘ওয়াতে লিপ্ত মুসলিমের মধ্যে প্রতিক্রিয়ামূলক ‘সহিংসতা’র আবেগ তৈরি হয়। এর সাথে ‘দ্রুত ফললাভে’ চিন্তা ‘দাওয়াত’ বা ‘দ্বীন প্রতিষ্ঠা’র কর্মে রত ব্যক্তিকে ইসলাম নির্দেশিত এ ‘অহিংস’ পদ্ধতি পরিত্যাগ করে আবেগ নির্দেশিত ‘সহিংস’ পথে যাওয়ার প্ররোচনা দেয়। তিনি ভাবতে থাকেন ‘সহিংসতা’ বা কল্পিত ‘জিহাদ’ই দ্রুত ফললাভের বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথ, যদিও প্রকৃত সত্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামের ইতিহাসে ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর সহিংসতা, তথাকথিত ‘জিহাদ’ ও ‘শাহাদতের’ অনেক ঘটনা আছে। তারা সকলেই ‘দ্রুত ফললাভের’ আবেগ নিয়ে বৈধ বা কল্পিত ‘জিহাদে’ ঝাপিয়ে পড়ে ‘শহীদ’ হয়েছেন, কিন্তু কেউই দ্রুত বিজয় তো দূরের কথা কোনো স্থায়ী বিজয়ই অর্জন করতে পারেন নি। বস্ত্তত ইসলামের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ‘অহিংস’ ও ‘মন্দের মুকাবিলায় উৎকৃষ্টতর’ আচরণই ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের বিজয়ের একমাত্র পথ। এ পদ্ধতিতেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরবের কঠোর হৃদয় যাযাবরদের হৃদয় জয় করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। পরবর্তী সকল যুগে এ পদ্ধতির অনুসরণকারী আলিম ও ‘দাঈ’গণই ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও প্রসারে সর্বোচ্চ অবদান রেখেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন।

[1] সূরা ৬: মায়িদা, আয়াত ১০৫।

[2] সূরা ২৮: কাসাস: ৫৬ আয়াত।

[3] সূরা ১২: ইউসূস: ১০৩ আয়াত।

[4] সূরা ১০: ইউনুস: ৯৯ আয়াত।

[5] সূরা হা মীম সাজদা (ফুসসিলাত): ৩৩-৩৫ আয়াত।

[6] সূরা মুমিনূন, ৯৬ আয়াত।

মুমিন অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, প্রতিকারের চেষ্টা করেন বা দাওয়াত দেন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাওয়াবের জন্য, জাগতিক ফলালল বা নিজের স্বার্থের জন্য নয়। কাজেই এক্ষেত্রে শরীয়ত সম্মত সুন্নাত পদ্ধতিতে দাওয়াত দিতে হবে, দাওয়াতের জন্য কোনো হারাম বা মাকরুহ কর্ম করা তো দূরের কথা, দাওয়াতের জন্য কোনো মুস্তাহাব কর্ম বর্জন করাও সুন্নাত বিরোধী। ‘‘আল্লাহর পথে দাওয়াত’’ পুস্তিকাতে আমি বিষয়টি আলোচনা করেছি। কিন্তু এ সকল আবেগতাড়িত মানুষ অন্যের জীবনে বা সমাজে ও রাষ্ট্রে ‘‘ইসলাম প্রতিষ্ঠা’’-র জন্য নিজের জীবনে ‘‘পাপ প্রতিষ্ঠা’’ করেন। ইসলামের মূলনীতি, পূন্য অর্জনের চেয়ে পাপ বর্জন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি যদি কোনো কর্ম ফরয হওয়া বা হারাম হওয়ার দ্বিবিধ সম্ভাবনা থাকে তবে তা বর্জন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:

إذا أمرتُكُمْ بِشيءٍ فأْتُوا مِنْهُ ما استطعتُمْ ، و إذا نهيْتُكُمْ عن شيءٍ فدَعُوهُ

‘‘আমি যখন তোমাদেরকে কোনো কর্মের নির্দেশ প্রদান করি তখন তোমরা সে কর্মের যতটুকু পার পালন করবে। আর যখন আমি তোমাদেরকে কোনো কর্ম থেকে নিষেধ করি তখন তোমরা সে কর্ম সর্বোতভাবে বর্জন করবে।’’[1] খারিজীগণের বিভ্রান্তি অপনোদনে সাহাবীগণের বক্তব্যে আমরা বিষয়টি দেখতে পাব। অনেক সময় শয়তান আবেগের মাধ্যমে মুমিনকে এ মূলনীতি থেকে সরিয়ে নিয়ে সাওয়াবের নামে পাপে লিপ্ত করে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো দাওয়াত বা দীন প্রতিষ্ঠার নামে কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট করা বা কারো সম্পদ, সম্ভ্রম বা প্রাণের সামান্যতম ক্ষতি করা। এভাবে মুমিন ইবাদত পালনের নামে কঠিনতম হারাম কর্মে লিপ্ত হন। ইবাদতটি যদি ফরযও হয় তাহলেও তা বিনা ওজরে ইচ্ছাকৃতভাবে বর্জন করলে শুধু আল্লাহর হক্ক নষ্ট হয়, যা আল্লাহ তাওবা বা ওজরের কারণে ক্ষমা করবেন। কিন্তু এ ইবাদত পালনের নামে মানুষের হক্ক নষ্ট করলে বা ক্ষতি করলে তা কঠিন হারাম হওয়া ছাড়াও ‘‘বান্দার হক্ক’’ সংশি­ষ্ট হওয়ার কারণে তাওবা করলেও আল্লাহ তা ক্ষমা করেন না।
ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে সম্মানিত বস্ত্ত মানব জীবন ও মানুষের হক্ক বা অধিকার। মানুষকে আল্লাহ সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছেন। শুধুমাত্র ‘আইনানুগ বিচার’ অথবা ‘যুদ্ধের ময়দান’ ছাড়া অন্য কোনোভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করা, সন্ত্রস্ত করা, আঘাত করা, কষ্ট দেওয়া বা কোনোভাবে কারো ক্ষতি করা, কারো সম্পদ বা সম্ভ্রমের সামান্যতম ক্ষতি করা কঠিনতম হারাম কর্ম। এ বিধান সর্বজনীন। কোনো ধর্মের কোনো মানুষকেই উপরের দুটি অবস্থা ছাড়া হত্যা করা, আঘাত করা বা কষ্ট দেওয়া যাবে না।

কুরআন ও হাদীসে এ বিষয়ে অগণিত নির্দেশনা রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে ‘মানব রক্ত’ কঠিনতম হারাম। একমাত্র সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনে ‘মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই’ একজন মানুষের হত্যা বৈধ করা হয়েছে শুধু এ দুটি ক্ষেত্রে। এ দুটি বিষয়ই সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা খুব সহজেই বুঝি যে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিচার, জিহাদ বা হত্যার অনুমতি থাকলে পৃথিবীর বুকে কোনো মানুষই বেঁচে থাকতে পারবে না। কারণ পৃথিবীর বুকে প্রায় প্রতিটি মানুষ অন্য কোনো না কোনো মানুষের দৃষ্টিতে জালিম, অনাচারী বা কাফির। কাজেই জুলম, অনাচার বা কুফরের কারণে যদি রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত স্বচ্ছ বিচারপদ্ধতি বা জিহাদের মাধ্যম ছাড়া ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বিচার ও জিহাদের ক্ষমতা বা অধিকার ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে দুনিয়াতে কেউই বেঁচে থাকতে পারবে না।

বিচার ও জিহাদের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড বা হত্যার ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি যে, বিচারকের ভুলে নিরপরাধীর সাজা হওয়ার চেয়ে অপরাধীর বেঁচে যাওয়া বা সাজা কম হওয়া ভাল। অনুরূপভাবে জিহাদের নামে ভুল মানুষকে হত্যা করার চেয়ে জিহাদ না করা অনেক ভাল। জিহাদের নামে ভুল মানুষকে হত্যা করলে শত পুন্য করেও জান্নাত থেকে বঞ্চিত হতে হবে। পক্ষান্তরে সাধারণভাবে আজীবন জিহাদ না করলেও এরূপ শাস্তিলাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। বিশেষত জিহাদের গুরুত্ব অনুধাবন করা সত্ত্বেও জিহাদের শর্ত না পাওয়ায় জিহাদ বর্জন করলে কোনোরূপ গোনাহ হবে বলে কুরআন কারীমে বা হাদীস শরীফে কোথাও উল্লেখ করা হয় নি।[2]

বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমাকে যদি নিহত হতে হয় সেও ভাল, তবে হত্যকারী হয়ো না। মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধ, সন্ত্রাস বা হানাহানির সময়ে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন:


ليكن عبد الله المقتول ولا يكن عبد الله القاتل ... ليكن كخير ابني ادم


‘‘এরূপ পরিস্থিতিতে মুমিন নিহত হোক, কিন্তু সে যেন হত্যাকারী না হয়।’’ ‘‘সে যেন আদমের দু সন্তানের মধ্যে (হাবিল ও কাবিল) উত্তম জনের (হাবিলের) মত হয়।’’[3] এ সকল নির্দেশনার কারণে সাহাবীগণ হত্যাকে ভয়ঙ্করভাবে ভয় পেতেন। খলীফা উসমান ইবনু আফ্ফান (রা) বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হলে সেনাবাহিনী এবং সমাজের নেতৃবৃন্দ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের ও অস্ত্রধারণের অনুমতি প্রার্থনা করেন। ইসলামী শরীয়তে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বৈধ। কিন্তু উসমান (রা) বিদ্রোহীদের বুঝানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন, আর বিদ্রোহীরা সুযোগ পেয়ে তাকে হত্যা করে। উসমান (রা)-এর মূলনীতি ছিল, আমি নিহত হতে রাজি, কিন্তু কারো রক্তের দায়িত্ব নিয়ে আল্লাহর কাছে যেতে রজি নই।


[1] বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৬৫৮: মুসলিম, আস-সহীহ ২/৯৭৫।

[2] বুখারী, আস-সহীহ ৪/১৬৪১; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/১৮৪, ৩১০; তিরমিযী, আস-সুনান ৪/৩৩; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৪/৪২৬; শাওকানী, মুহাম্মাদ ইবনু আলী (১২৫৫ হি.) নাইলুল আউতার, ৭/২৭১-২৭২; আল-আমিদী, আলী ইবনু মুহাম্মাদ (৬৩১ হি.), আল-ইহকাম ২/১৩০, ৪/৬৫।

[3] আবু দাউদ, আস-সুনান ৪/১০০; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১৩১০; আলবানী, ইরওয়াউল গালীল ৮/১৪৩। হাদিসটি সহীহ।
৩. ৪. রাষ্ট্রীয় ফরয বনাম ব্যক্তিগত ফরয

ইসলম পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এজন্য কুরআন ও হাদীসে মানব জীবনের সকল দিকের বিধিবিধান বিদ্যমান। কোনো বিধান ব্যক্তিগতভাবে পালনীয়, কোনো বিধান সামাজিকভাবে বা রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনীয়। প্রত্যেক বিধান পালনের জন্য নির্ধারিত শর্তাদি রয়েছে। কুরআনে ‘সালাত’ প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবার কুরআনে ‘চোরের হাত কাটার’, ‘ব্যভিচারীর বেত্রাঘাতের’ ও জিহাদ বা কিতালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম ইবাদতটি ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনীয়। অন্য কেউ পালন না করলেও মুমিনকে ব্যক্তিগভাবে পালন করতেই হবে। কিন্তু দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ নির্দেশটি ‘রাষ্ট্রীয় ভাবে’ পালনীয়। কখনোই একজন মুমিন তা ব্যক্তিগতভাবে বা দলগতভাবে পালন করতে পারেন না।
এখানে লক্ষণীয় যে, কোনো ইবাদতের শর্তাবলি কুরআনে একত্রে বা একস্থানে উল্লেখ করা হয় নি। এছাড়া অধিকাংশ ইবাদতের সকল শর্ত কুরআনে উল্লেখ করা হয় নি। কুরআন ও হাদীসের সামগ্রিক বিধান বা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর সামগ্রিক জীবন ও এ সকল নির্দেশ পালনে তাঁর রীতি-পদ্ধতি থেকেই সেগুলির শর্ত ও পদ্ধতি বুঝতে হবে। তা নাহলে বিভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। মহান আল্লাহ বলেন:


أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ إِلَىٰ غَسَقِ اللَّيْلِ


‘‘সূর্য হেলে পড়ার পর হতে রাত্রির ঘন অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম করবে।’’[1]
এ নির্দেশের উপর নির্ভর করে যদি কেউ সূর্যাস্তের সময় সালাতে রত হন তবে তিনি নিজে যতই দাবি করুন, মূলত তা ইসলামী ইবাদাত বলে গণ্য হবে না, বরং তা পাপ ও হারাম কর্ম বলে গণ্য হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাদীস শরীফে ‘সূর্য হেলে পড়ার পর থেকে রাত্রি পর্যন্ত’ সময়ের মধ্যে সালাত আদায়ের বৈধ ও অবৈধ সময় চিহ্নিত করেছেন এবং সূর্যাস্তের সময় সালাত আদায় অবৈধ করেছেন। এভাবে আমরা দেখছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শিক্ষার বাইরে মনগড়াভাবে কুরআন কারীমের অর্থ বা ব্যাখ্যা করা আমাদেরকে ইবাদতের নামে পাপের মধ্যে লিপ্ত করে। অনুরূপভাবে কুরআনে ‘শাস্তি’ ও ‘কিতালের’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআন-হাদীসে এ ইবাদত পালনের অনেক শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ যদি সেগুলি পূরণ না করে হত্যা, রক্তপাত ইত্যাদি কর্মে লিপ্ত হয়ে এগুলি জিহাদ বলে দাবি করেন, তবে তা কখনোই ইসলামী ইবাদাত বলে গণ্য হবে না, বরং তা হবে কঠিন পাপ ও হারাম কর্ম।

শর্ত পূরণ ছাড়া সালাত পালনের চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর পাপ শর্ত পূরণ ছাড়া শাস্তি, বিচার বা হত্যায় লিপ্ত হওয়া। সালাত ও বিচার-হত্যার মধ্যে পার্থক্য হলো, সূর্যাস্তের সময় সালাত আদায় করলে উক্ত ব্যক্তি গোনাহগার হলেও, তাতে কোনো বান্দার হক নষ্ট হবে না। কিন্তু বিচার, শাস্তি ও কিতালের সাথে ‘বান্দার’ হক জাড়িত। কারো ভীতি প্রদর্শন, রক্তপাত বা সম্পদ নষ্ট করা কঠিনতম কবীরা গোনাহ, যা সংশি­ষ্ট ব্যক্তির ক্ষমা ছাড়া আল্লাহ ক্ষমা করেন না। কোনো মানুষকে হত্যার বিষয়ে সামান্য সহযোগিতা বা চোখের ইশারাও ভয়ঙ্কর পাপ বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। কাজেই রাষ্ট্রীয় অবকাঠামের মধ্যে আইনানুগ বিচারের বাইরে বা রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দেশে শত্রুবাহিনীর যোদ্ধাদের সাথে ঘোষিত ও আইনানুগ যুদ্ধের বাইরে যদি কেউ হত্যা, আঘাত, ভয় প্রদর্শন, সম্পদ-ধ্বংস ইত্যাদি কাজে লিপ্ত হন, তবে ইবাদত কবুল না হওয়া এবং গোনাহগার হওয়া ছাড়াও তিনি বান্দার হক্ক নষ্ট করার ভয়ঙ্করতম পাপে লিপ্ত হবেন।

[1] সূরা: ১৭ বানী ইসরাঈল, ৭৮ আয়াত।

বিচারের ক্ষেত্রে নরহত্যা, বিবাহিতের ব্যভিচার ও স্বেচ্ছায় বুঝে শুনে ইসলাম গ্রহণ করার পরে ইসলাম ত্যাগ করলে তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার বিধান আছে। এ জন্য অনেক কঠিন শর্ত রয়েছে। বিচারক সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন মৃত্যুদন্ড না দেওয়ার। অপরাধের পূর্ণতার বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহ থাকলেও আর মৃত্যুদন্ড প্রদান করা যাবে না। কারণ, বিচারকের ভুলে নিরপরাধের শাস্তি বা কম অপরাধীর বেশি শাস্তি হওয়ার চেয়ে অপরাধীর মুক্তি বা বেশি অপরাধের কম শাস্তি হওয়া বাঞ্চনীয়।
এ বিচার অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বিচারকের আদালতে যথাযথ সাক্ষ্য, প্রমাণ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে। মুমিনকে ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায়ের নিষেধ ও পরিবর্তন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাকে অন্যায়ের বিচার বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় নি। আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:


مَن رأى مِنكُم مُنكرًا فليغيِّرهُ بيدِهِ ، فإن لَم يَستَطِع فبِلسانِهِ ، فإن لم يستَطِعْ فبقَلبِهِ . وذلِكَ أضعَفُ الإيمانِ


‘‘তোমাদের কেউ যদি কোন অন্যায় দেখে তবে সে তার বাহুবল দিয়ে তা পরিবর্তন করবে। যদি তাতে সক্ষম না হয় তবে সে তার বক্তব্যের মাধ্যমে তা পবিবর্তন করবে। এতেও যদি সক্ষম না হয় তবে সে তার অন্তর দিয়ে তা পরিবর্তন (কামনা) করবে, আর এ ঈমানের দুর্বলতম পর্যায়।’’[1] প্রত্যেক মুমিনেরই দায়িত্ব অন্যায় দেখতে পেলে সাধ্য ও সুযোগ মত তার পরিবর্তন বা সংশোধন করা। যেমন মদপান একটি মুনকার বা অন্যায়। কেউ অন্য কাউকে মদপান করতে দেখলে সম্ভব হলে তা ‘পরিবর্তন’ করবেন। অর্থাৎ তিনি মদপান বন্ধ করবেন। তা সম্ভব না হলে তিনি মুখ দ্বারা তা নিষেধ করবেন। তাও সম্ভব না হলে তিনি অন্তর দিয়ে তা পরিবর্তন করবেন, অর্থাৎ তা পরিবর্তন করার পরিকল্পনা করবেন বা ঘৃণা করবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই মুমিন ‘মদপানের’ অপরাধে উক্ত ব্যক্তিকে বিচার করতে বা শাস্তি দিতে পারবেন না। প্রয়োজনে তিনি উক্ত ব্যক্তিকে আইনের হাতে সোপর্দ করবেন বা মদপানের ইসলামী শাস্তি প্রবর্তনের জন্য দাওয়াত অব্যাহত রাখবেন। কাউকে কোনো অপরাধে লিপ্ত দেখে তাকে বিচারকের নিকট সোপর্দ করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে বিচার ছাড়া কেউ শাস্তি দিতে পারেন না। এ প্রক্রিয়ার বাইরে স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধান বিচারপতিও কাউকে শাস্তি দিতে পারেন না।
খলীফা উমার (রা) আব্দুর রাহমান ইবনু আউফ (রা) -কে বলেন,

لو رأيت رجلا على حد زنا او سرقة وانت امير فقال شهادتك شهادة رجلا من المسلمين قال صدقت

‘‘আপনি শাসক থাকা অবস্থায় যদি কাউকে ব্যভিচারের অপরাধে বা চুরির অপরাধে রত দেখতে পান তাহলে তার বিচারের বিধান কী? (নিজের দেখাতেই কি বিচার করতে পারবেন?)’’ আব্দুর রাহমান (রা) বলেন, ‘‘আপনার সাক্ষ্যও একজন সাধারণ ২ মুসলিমের সাক্ষ্যের সমান।’’ উমার (রা) বলেন, ‘‘আপনি ঠিকই বলেছেন।’’[2] অর্থাৎ রাষ্ট্রপ্রধান নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে পারবেন না। এমনকি তার সাক্ষ্যের অতিরিক্ত কোনো মূল্যও নেই। রাষ্ট্রপ্রধানের একার সাক্ষ্যে কোনো বিচার হবে না। বিধিমোতাবেক দুইজন বা চারজন সাক্ষীর কমে বিচারক কারো বিচার করতে পারবেন না।

অন্য ঘটনায় উমার (রা) রাত্রে মদীনায় ঘোরাফেরা করার সময় একব্যক্তিকে ব্যভিচারে লিপ্ত দেখতে পান। তিনি পরদিন সাহাবীগণকে জিজ্ঞাসা করেন, যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাউকে ব্যভিচারে লিপ্ত দেখতে পান তাহলে তিনি কি শাস্তি প্রদান করতে পারবেন? তখন আলী (রা) বলেন, কখনোই না। আপনি ছাড়া আরো তিনজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী যদি অপরাধের সাক্ষ্য না দেয় তাহলে আপনার উপরে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি প্রয়োগ করা হবে।[3]

[1] মুসলিম, আস-সহীহ ১/৬৯।

[2] বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৬২২।

[3] আবদুর রহমান ইবনু আবী বাকর সালিহী (৮৫৬ হি.), আল-কানযুল আকবার ১/২২৭।
৩. ৬. জিহাদ ও হত্যা - (৩. ৬. ১. জিহাদ বিষয়ক অপপ্রচার)

ইসলাম বিষয়ক বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের মূলে রয়েছে ‘‘জিহাদ’’। অনেক সময় বলা হয়, ধর্মই সকল হানাহানির মূল, ধর্মের নামেই রক্তপাত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। কী জঘন্য মিথ্যাচার!! এ কথা সত্য যে, অনেক সময় ধর্মকে হানাহানির হাতিয়ার বানানো হয়, আবার অনেক সময় ধর্ম সত্য ও ন্যায়ের স্বার্থে যুদ্ধের অনুমতি দেয়। কিন্তু কখনোই ধর্মের নামে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত হয় নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কমুনিষ্ট চীনের সাথে কমুনিষ্ট ভিয়েতনামের যুদ্ধ, আমেরিকার সাথে ভিয়েতনামের যুদ্ধ ইত্যাদি যুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ মরেছে। কম্পূচীয়ায় কমুনিষ্ট খেমার রূজের হাতে লক্ষলক্ষ মানুষের ভয়ঙ্কর মৃত্যু, জোসেফ স্টালিনের নির্দেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের হত্যা, মাওসেতুং-এর চীনে প্রায় দু কোটি মানুষের হত্যা, মুসোলিনির নির্দেশে ইটালির ৪ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও এরূপ অগণিত মানুষের হত্যা সবই কি ধর্মের নামে হয়েছে?
কখনো বলা হয়, ইসলামই ধর্মের নামে ‘‘জিহাদ’’ বা ‘‘ধর্মযুদ্ধ’’ বৈধ করেছে। এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর কী হতে পারে? হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ মহাভারত ও রামায়ন পুরোটায় যুদ্ধ ও হানাহানি নিয়ে। গীতা ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে যুদ্ধের নির্দেশ রয়েছে। বাইবেলে বারংবার যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা পরবর্তী অনুচ্ছেদে ‘‘বাইবেলীয় জিহাদ’’ ও ‘‘ইসালমের জিহাদ’’ বিষয়ে কিছু আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
জিহাদ বিষয়ক আরেকটি বিভ্রান্তি জিহাদকে ‘‘পবিত্র যুদ্ধ’’ বা ‘‘ধর্মযুদ্ধ’’ বলে আখ্যায়িত করা। জিহাদ অর্থ কখনোই ‘‘পবিত্র যুদ্ধ’’ (holy war) বা ‘‘ধর্মযুদ্ধ’’ (relegious war/crusade) নয়। পবিত্র যুদ্ধ, ধর্মযুদ্ধ, ক্রুসেড ইত্যাদি সবই খৃস্টান চার্চ ও যাজকদের আবিষ্কৃত পরিভাষা। আমরা পরবর্তী অনুচ্ছেদে দেখব যে, ইসলামের পরিভাষায় জিহাদ অর্থ ‘‘রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ’’। মুসলিম রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় যুদ্ধকে ইসলামের জিহাদ বলা হয়েছে। সাধারণভাবে কাফির বা অমুসলিম রাষ্ট্রই মুসলিম রাষ্ট্রের শত্রুরাষ্ট্র; এজন্য জিহাদের ক্ষেত্রে শত্রুদেরকে ‘‘কাফির’’, ‘‘মুশরিক’’ বা অমুসলিম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিহাদ বিষয়ে আরেকটি বিভ্রান্তি হলো, মুসলিমরা ধর্মপ্রচার বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ করে বা ইসলাম তরবারীর জোরে প্রচারিত হয়েছে বলে দাবি করা। এটি শুধু জঘন্য মিথ্যাই নয়, বরং প্রকৃত সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য। পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব যে, বাইবেলে ধর্মের কারণে মানুষ হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বারংবার বিধর্মীদের উপাসনালয় ভেঙ্গে ফেলার, দেশের বিধর্মী নাগরিকদের উৎসবে ডেকে এনে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করার ও নিরিহ বির্ধমীদের ধরে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।[1]

৩২৫ খৃস্টাব্দে সম্রাট কনস্টানটাইন খৃস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দেন। সেদিন থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত খৃস্টান চার্চ, পোপ, প্রচারক ও রাষ্ট্রগুলির ইতিহাস হলো রক্তের ইতিহাস। অধার্মিকতা বা heresy দমনের নামে অথবা ধর্ম প্রচারের নামে পরধর্ম অসহিষ্ণুতা, পরধর্মের প্রতি বিষোদ্গার, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, অন্য ধর্মাবলম্বীদের হত্যা, নির্যাতন বা জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ করা খৃস্টান ধর্মের সুপরিচিত ইতিহাস। পক্ষান্তরে ইসলামে শুধু রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্যই যুদ্ধ বৈধ করা হয়েছে, ধর্ম প্রচারের জন্য নয়। ইসলামে যুদ্ধের ময়দান ছাড়া কখনোই অমুসলিম হওয়ার কারণে কাউকে হত্যা করা হয় নি বা জোরপূর্বক মুসলিম বানানো হয় নি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)- এর মদীনায় আগমনের পূর্বে তথাকার অনেকের সন্তান ইহূদী ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এরা ইসলাম গ্রহণের পরে তাদের সন্তানদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে এরূপ চাপ প্রয়োগ থেকে নিষেধ করেন এবং তাদেরকে তাদের পছন্দের ধর্ম পালনের অধিকার প্রদান করেন।[2]
দীন প্রতিষ্ঠা বা দীন প্রচারের জন্য হত্যা, জিহাদ বা যুদ্ধ তো দূরের কথা কোনোরূপ শক্তিপ্রয়োগও নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেছেন:

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

‘‘দীনে কোনো জবরদস্তি নেই। ভ্রান্তি থেকে সত্য সুস্পষ্ট হয়েছে। যে তাগূতকে অবিশ্বাস করবে এবং আল্লাহকে বিশ্বাস
করবে সে এমন এক মযবুত হাতল ধরবে যা কখনো ভাঙ্গবে না। আল্লাহ সর্বশ্রোতা প্রজ্ঞাময়।’’[3]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

من قتل نفسًا معاهدًا لم يَرَحْ رائحةَ الجنةِ ، وإنَّ رِيحَها ليُوجدُ من مسيرةِ أربعين عامًا

‘‘যদি কোনো ব্যক্তি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিক বা মুসলিম দেশে অবস্থানকারী অমুসলিম দেশের কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করে তবে সে জান্নাতের সুগন্ধও লাভ করতে পারবে না, যদিও জান্নাতের সুগন্ধ ৪০ বৎসরের দুরত্ব থেকে লাভ করা যায়।’’[4]
বিধর্মীকে হত্যা তো দূরের কথা, বিধর্মীর সাথে অভদ্র আচরণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। তাদের ধর্মবিশ্বাস বা উপাস্যদেরকে গালি দিতে নিষেধ করা হয়েছে। মুসলিম তাঁর নিজের বিশ্বাসের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করবেন, তবে কারো গালি দিবেন না বা কারো অনুভূতি আহত করবেন না। কারণ এতে পারস্পারিক গালাগালিই বাড়বে। প্রত্যেকেই তো তার ধর্মকে ভালবাসে। আল্লাহ মানব প্রকৃতি এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। আর কারো ভক্তি ও ভালবাসা আহত করার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। মহান আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ كَذَٰلِكَ زَيَّنَّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُمْ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّهِمْ مَرْجِعُهُمْ فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

‘‘আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে তারা ডাকে তাদেরকে তোমরা গালি দিও না; কারণ এতে তারাও সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দিবে। এভাবেই আমি প্রত্যেক জাতির দৃষ্টিতে তাদের কার্যকলাপ সুশোভন করেছি; অতঃপর তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের প্রত্যাবর্তন, তখন তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন।’’[5]
অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:


وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ


‘‘তোমরা উত্তম পন্থায় ছাড়া অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের অনুসারীদের সাথে বিতর্ক করবে না, তবে তাদের মধ্যে যারা সীমালঙ্ঘন করেছে তারা ব্যতিক্রম।’’[6] জুইশ এনসাইক্লোপিডীয়া, অন্যান্য বিশ্বকোষ ও ইতিহাস প্রমাণ করে যে, বিগত দেড় হাজার বছরে ইউরোপের সকল খৃস্টান দেশে ইহূদীদের উপর বর্বর অত্যাচার করা হয়েছে, জোর পূর্বক তাদের ধর্মান্তরিত করা হয়েছে, তাদেরকে গণহারে হত্যা করা হয়েছে, তাদেরকে গণ-আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়েছে এবং নানভাবে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। অথচ এ সময়ে মুসলিম দেশগুলিতে ইহূদীরা পরিপূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে বসবাস করেছেন।

প্রায় দেড় হাজার বৎসর ধরে মুসলিমগণ আরববিশ্ব শাসন করেছেন। সেখানে দেড় কোটিরও বেশি খৃস্টান ও কয়েক লক্ষ ইহূদী এখন পর্যন্ত বংশপরম্পরায় বসবাস করছে। ভারতে মুসলিমগণ প্রায় একহাজার বছর শাসন করেছেন, সেখানে প্রায় শতকরা ৮০ জন হিন্দু। অথচ খৃস্টানগণ যে দেশই দখল করেছেন, জোরযবরদস্তি করে বা ছলে-বলে সেদেশের মানুষদের ধর্মান্তরিত করেছেন অথবা হত্যা ও বিতাড়ন করেছেন।

ইসলাম যদি তরবারীর জোরেই প্রচারিত হবে তাহলে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইসলামী দেশ হলো কি করে? ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন্স, ব্রুনাই ও অন্যান্য দেশে তো কোনো মুসলিম বাহিনী কখনোই যায় নি। বিগত অর্ধ শতাব্দি যাবৎ ইসলাম The firstest growing religion বা সর্বাধিক বর্ধনশীল ধর্ম। ইউরোপ ও আমেরিকা-সহ সকল দেশের হাজার হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছেন। কোন্ তরবারীর ভয়ে তারা ইসলাম গ্রহণ করছেন?

[1] বাইবেল, ১ রাজাবলি ১৮/৪০; ২ রাজাবলি ১০/১৮-২৮।

[2] আবু দাউদ, আস-সুনান (কিতাবুল জিহাদ, বাবুল আসীর ইউকরাহু) ৩/৫৮। হাদিসটি সহীহ।

[3] সূরা বাকারা। ২৫৬ আয়াত।

[4] বুখারী, আস-সহীহ ৩/১১৫৫, ৬/২৫৩৩; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২২৭৮।

[5] সূরা ৬: আন’আম, ১০৮ আয়াত।

[6] সূরা ২৯: আনকাবুত, ৪৬ আয়াত।
৩. ৬. ২. ইসলামী শরীয়তে জিহাদ ও তার পূর্বশর্ত

‘জিহাদ’ অর্থ প্রচেষ্টা, সংগ্রাম, পরিশ্রম ইত্যাদি।[1] আল্লাহর বিধান পালনের ও প্রচারের সকল শ্রম বা প্রচেষ্টাকেই কুরআন ও হাদীসে কখনো কখনো ‘জিহাদ’ বলা হয়েছে। যেমন, কাফির-মুনাফিকদের দাওয়াত দেওয়া ও তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদকে জিহাদ বলা হয়েছে।[2] যালিম শাসকের সামনে সত্য ও ন্যায়ের কথা বলাকে সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে।[3] হজ্জকে জিহাদ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জিহাদ বলা হয়েছে।[4] আল্লাহর আনুগত্য-মূলক বা আত্মশুদ্ধিমূলক যে কোনো কর্মের চেষ্টাকে জিহাদ বলা হয়েছে।[5] তবে ইসলামী পরিভাষায় ও ইসলামী ফিক্হে জিহাদ বলতে ‘‘কিতাল’’ বা মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় যুদ্ধকেই বুঝানো হয়। ফিকহের পরিভাষায় সর্বদা জিহাদ অর্থ কিতাল বলা হয়েছে।[6]

কতল অর্থ হত্যা করা। আর কিতাল অর্থ পরস্পরে যুদ্ধ। এজন্য জিহাদ বা কিতালের মূল শর্ত হলো সামনাসামনি ‘যুদ্ধ’। পিছন থেকে হত্যা করা, না জানিয়ে হত্যা করা, গুপ্ত হত্যা করা এগুলি কখনোই ইসলামী কিতাল বা জিহাদ নয়। মদীনার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নেতৃত্বে মুসলিমগণ অনেক ‘কিতাল’ করেছেন। যুদ্ধের ময়দান ছাড়া কাফিরদের দেশে যেয়ে গোপনে হত্যা, সন্ত্রাস, অগ্নি সংযোগ, বিষ প্রয়োগ ইত্যাদি কখনোই তিনি করেন নি বা করার অনুমতি প্রদান করেন নি। দুই-একটি ক্ষেত্রে যুদ্ধরত সামরিক নেতা বা মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীকে যথাসম্ভব কম রক্তপাতে মৃত্যুদন্ড প্রদানের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গোপন ‘‘কমান্ডো’’ অভিযান পারিচালনা করার অনুমতি দেন তিনি। কাব ইবনু আশরাফ ও আবূ রাফি সালাম ইবনু আবিল হুকাইক-এর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে কমান্ডো অভিযান ছিল এ পর্যায়ের। এরূপ অভিযানের মাধ্যমে তিনি মুসলিম বাহিনী ও শত্রু বাহিনী উভয় পক্ষের হতাহতের সংখ্যা প্রায় শূন্যে আনতে সক্ষম হয়েছেন।[7] রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এরূপ কমান্ডো হামলা ছাড়া অন্য কোনোভাবে যুদ্ধের ময়দান ও বিচার ছাড়া তিনি হত্যার অনুমতি দেন নি। এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও অযোদ্ধাকে আঘাত করতে তিনি নিষেধ করেছেন।

কিতাল বা যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইসলাম অনেক শর্ত আরোপ করেছে। সেগুলির অন্যতম (১) রাষ্ট্রের বিদ্যমানতা ও রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি, (২) রাষ্ট্র বা মুসলিমদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া, (৩) সন্ধি ও শান্তির সুযোগকে প্রাধান্য দেওয়া ও (৪) কেবলমাত্র যোদ্ধা লক্ষ্যবস্ত্ততে আঘাত করা।

(১) রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমোদন
ইসলামে জিহাদের বৈধতার সর্বপ্রথম শর্ত হলো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব। কিতাল বা জিহাদ কখনোই ইসলামী রাষ্ট্র বা ইসলামী বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম নয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র মাধ্যম ‘দা‘ওয়াত’ বা প্রচার। কিতাল হলো প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সংরক্ষণ, রাষ্ট্র ও নাগরিকদের নিরাপত্তার মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। দাওয়াতের বিরুদ্ধে অমানবিক বর্বরতা ও সহিংস প্রতিরোধকে তিনি পরিপূর্ণ অহিংস উত্তম আচরণ দিয়ে মুকাবিলা করেছেন। আবূ বাকর, উমার, উসমান, আব্দুর রাহমান ইবনু আউফ ও মক্কার আরো অনেক শীর্ষস্থানীয় সামাজিক নেতা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের সাথে সাধারণ অনেক মুসলিম ছিলেন। তাঁরা সর্বদা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)এর কাছে অনুমতি চেয়েছেন কাফিরদের সহিংস আচরণকে প্রতিরোধ করতে বা তাদের বর্বরতার প্রতিবাদে অস্ত্র তুলে নিতে। কিন্তু কখনোই সে অনুমতি দেওয়া হয় নি। এক পর্যায়ে দাওয়াতের ভিত্তিতে মদীনার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইসলামী জীবনব্যবস্থা মেনে নেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তাঁদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে গ্রহণ করেন। এভাবে দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মুশরিকগণ এ নতুন রাষ্ট্রটিকে অঙ্কুরেই বিনাশ করতে চেষ্টা করে। তখন রাষ্ট্র ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জিহাদের বিধান প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রের বিদ্যমানতা ও রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমতি বা নির্দেশ জিহাদের বৈধতার শর্ত বলে উল্লেখ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:


إنما الإمامُ جُنةٌ . يُقاتلُ من ورائهِ

‘‘রাষ্টপ্রধান ঢাল, যাকে সামনে রেখে যুদ্ধ পরিচালিত হবে।’’[8]
এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, সাহাবীগণ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের বাইরে যুদ্ধ বা কিতালে লিপ্ত হন নি। আলী (রা)-এর সাথে মু‘আবিয়া (রা)-এর যুদ্ধ ছিল রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ। ইয়াযিদের বিরুদ্ধে ইমাম হুসাইনের যুদ্ধ ও উমাইয়া শাসকদের সাথে আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইরের যুদ্ধ ছিল একান্তই রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ। মুআবিয়ার (রা) মৃত্যুর পরে কূফাবাসীগণ ইমাম হুসাইনকে (রা) রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বাইয়াত করে পত্র লিখেন। তারা ইমাম হুসাইনকেই বৈধ রাষ্ট্রপতি হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ইয়াযিদের রাষ্ট্রক্ষমতার দাবি অস্বীকার করেন। এভাবে মুসলিম সমাজ দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইরের (রা) ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইরূপ ছিল। এ সকল বৈধ রাষ্ট্রীয় যুদ্ধও যেহেতু মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হতো, সেজন্য সাহাবীগণ সাধারণত এগুলিতে অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতেন, যদিও তাঁরা মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক বিদ্রোহী মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বৈধতা স্বীকার করতেন। আমরা দেখেছি যে, আলী (রা)-এর সময়ের যুদ্ধে ৩০ জনেরও কম সাহাবী অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রসিদ্ধ তাবিয়ী ইবনু সিরীন, যদিও তখন হাজার হাজার সাহাবী জীবিত ছিলেন। ৭৩ হিজরীতে হাজ্জাজ ইবনু ইউসূফ যখন মক্কা অবরোধ করে ইবনু যুবাইরের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক আক্রমন চালাতে থাকে, তখন দুই ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা)-এর নিকট এসে বলে,


إنَّ الناسَ ضَيَّعوا وأنتَ ابنُ عُمَرَ، وصاحبُ النبيَّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم، فما يَمنَعُكَ أن تَخرُجَ ؟ فقال : يَمنَعُني أنَّ الله حَرَّمَ دمَ أخي
وفي رواية: ما حملك على أن تحج عاماً وتعتمر عاماً وتترك الجهاد في سبيل الله عز وجل وقد علمت ما رغب الله فيه قال يا ابن أخي بني الإسلام على خمس إيمان بالله ورسوله والصلوات الخمس وصيام رمضان وأداء الزكاة وحج البيت


মানুষেরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আপনি ইবনু উমার, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)এর সাহাবী, আপনাকে বেরিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধা দিচ্ছে কিসে? তিনি বলেন, ‘‘আল্লাহ আমার ভাইয়ের রক্ত হারাম করেছেন, এ-ই আমাকে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধা দিচ্ছে।’’ অন্য বর্ণনায় তারা বলে, ‘‘কি কারণে আপনি এক বছর হজ্জ করেন আরেক বছর উমরা করেন এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ পরিত্যাগ করেন? অথচ আপনি জানেন যে, আল্লাহ জিহাদের জন্য কী পরিমাণ উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছেন?’’ তখন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) বলেন, ‘‘ভাতিজা, ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি বিষয়ের উপর: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (ﷺ) উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রামাযানের সিয়াম, যাকাত প্রদান ও বাইতুল্লাহর হজ্জ।’’[9]

এখানে আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) জিহাদের আদেশ ও হত্যার নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তুলনা করছেন। ইসলামের মূলনীতি, আদেশ পালনের চেয়ে নিষেধ বর্জন অগ্রগণ্য।[10] বিশেষত এ ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ কর্মটি কুরআন-হাদীসে বারংবার ভয়ঙ্করতম কবীরা গোনাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া জিহাদ আরকানে ইসলামের মত মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয় বা উদ্দিষ্ট (Aimed at; intended) ইবাদত নয়; বরং তা উদ্দিষ্ট ইবাদতগুলি পালনের উপকরণ (accessory; equipment; apparatus) মাত্র। জিহাদের মাধ্যমে মূল ইবাদগুলি পালনের পরিবেশ রক্ষা করা হয়। পরিবেশ বিদ্যমান থাকলে আর জিহাদের প্রয়োজন থাকে না। উদ্দিষ্ট ইবাদত কখনো স্থগিত হয় না; উপকরণ স্থগিত হতে পারে। সালাত, সিয়াম ইত্যাদি ইবাদত সর্বদা সর্বাবস্থায় পালনীয়। পক্ষান্তরে ‘‘জিহাদ’’ কেবলমাত্র এ সকল ইবাদত পালনের বিঘ্ন ঘটলেই পালনীয়। সালাত, সিয়াম, তিলাওয়াত, যিক্র ইত্যাদি কর্ম সরাসরি ইবাদত। মুমিন যত বেশি পালন করবেন ততবেশি সাওয়াব লাভ করবেন। পক্ষান্তরে জিহাদ হলো অপরাধীর শাস্তি দেওয়ার মত ইবাদত। এক্ষেত্রে যত বেশি অপরাধীর শাস্তি দেওয়া হবে তত বেশি সাওয়াব হবে বলে মনে করার কোনো সুযোগ নেই। যদি অপরাধ প্রমাণিত হয় তাহলে শরীয়ত অনুসারে শাস্তি প্রদান ইবাদত বা দায়িত্বে পরিণত হয়। এজন্য ইসলামে শাস্তি প্রদান প্রক্রিয়া কঠিন করা হয়েছে এবং সামান্যতম সন্দেহের ক্ষেত্রে শাস্তিপ্রদান থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আর এজন্যই জিহাদ এড়ানোর জন্য ইসলামে সন্ধি ও শান্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা পরবর্তী অনুচ্ছেদে তা আলোচনা করব, ইনশা আল্লাহ।

এথেকে আমরা বুঝতে পারি যে, জিহাদ মূলত ইসলামী রাষ্ট্রের সংরক্ষণ ও ইসলামী দাওয়াতকে এগিয়ে নেওয়ার ‘‘উপকরণ’’। প্রয়োজনে তা অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। তবে সর্বাবস্থায় চেষ্টা করতে হবে এ ব্যবস্থা এড়িয়ে সন্ধি বা শান্তির মাধ্যমে মূল উদ্দেশ্য সাধান করার। জিহাদের বারংবার আদেশ করা হলেও তার জন্য অনেক শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে, তাকে ফরয আইন বলে কোথাও উল্লেখ করা হয় নি এবং তা পরিত্যাগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কাজেই পরিত্যাগযোগ্য একটি কম পালনের জন্য মুমিন কখনোই ভয়ঙ্করতম একটি হারামে লিপ্ত হতে পারেন না। এক্ষেত্রে তাঁদের মূলনীতি ছিল যে, ভুল জিহাদের মানুষ হত্যা বা মানুষের ক্ষতি করার চেয়ে সঠিক জিহাদ বর্জন করা অনেক শ্রেয়।
এভাবে আমরা দেখি যে, সাহাবীগণ সন্দেহের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে বৈধ জিহাদেও অংশ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতেন। আর রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের বাইরে কখনোই কোনো যুদ্ধ তারা বৈধ বলে মনে করেন নি। খারিজীগণের আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী বিষয়ক হাদীসগুলিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খারিজীদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে পাবে তারা যেন তাদেরকে হত্যা করে।’’ সাহাবীগণ এ থেকে কখনোই বুঝেন নি যে, খারিজীদেরকে পেলেই হত্যা করতে হবে। তাঁরা কখনোই যুদ্ধের ময়দান ছাড়া অন্যত্র কোনো সুপরিচিত খারিজী নেতাকেও হত্যা করেন নি।[11]

(২) রাষ্ট্র বা মুসলিমের নিরাপত্তা
কিতালের অন্যতম শর্ত, শত্রুপক্ষ রাষ্ট্র আক্রমণ করবে বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হবে। মহান আল্লাহ বলেন:

أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا

‘‘যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হলো তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে।’’[12] মুসলিম রাষ্ট্রের ও নাগরিকগণের নিরাপত্তা ছাড়াও অন্যদেশের নির্যাতিত মুসলিম নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়ানো মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও জিহাদের প্রয়োজনে হতে পারে। যদি অন্য দেশের মুসলিম নাগরিকগণ কোনো মুসলিম দেশের সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং সে দেশের সাথে মুসলিম দেশের কোনো চুক্তি বা কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকে তাহলে মুসলিম রাষ্ট্র প্রয়োজনে সে দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারে বা তাদেরকে নির্যাতন থেকে রক্ষার ব্যবস্থা নিতে পারে। আল্লাহ বলেন:


إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ آوَوْا وَنَصَرُوا أُولَٰئِكَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يُهَاجِرُوا مَا لَكُمْ مِنْ وَلَايَتِهِمْ مِنْ شَيْءٍ حَتَّىٰ يُهَاجِرُوا وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ إِلَّا عَلَىٰ قَوْمٍ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ مِيثَاقٌ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ


‘‘নিশ্চয় যারা ঈমন এনছে, হিজরত করেছে (অমুসলিম সমাজ পরিত্যাগ করে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে) এবং নিজেদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে তারা একে অপরের অভিভাবক-বন্ধু। আর যারা ঈমান এনেছে, কিন্তু হিজরত করেনি, তাদের অভিভাবকত্বের (সাহায্যের) কোনোরূপ দায়িত্ব তোমাদের নেই, যতক্ষণ না তারা হিজরত করে। আর যদি তারা দীনের বিষয়ে তোমাদের নিকট কোনো সাহায্য চায় তবে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। তবে এরূপ জাতির বিরুদ্ধে নয় যাদের সাথে তোমাদের পারস্পরিক চুক্তি রয়েছে। আর তোমরা যা কর সে বিষয়ে আল্লাহ পূর্ণ দৃষ্টিমান।’’[13]


(৩) সন্ধি ও শান্তির সুযোগ গ্রহণ
আমরা দেখেছি যে, জিহাদ উদ্দিষ্ট ইবাদত নয়, উদ্দিষ্ট ইবাদত পালনের পরিবেশ রক্ষার উপকরণ। জিহাদের উদ্দেশ্য রাষ্ট্র, নাগরিক ও ইসলামী দাওয়াতের নিরাপত্তা রক্ষা করা। এ উদ্দেশ্য যদি জিহাদ ছাড়া অর্জিত হয় তবে তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য ইসলামে সন্ধি ও শান্তির সুযোগ গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

وَإِنْ جَنَحُوا لِلسَّلْمِ فَاجْنَحْ لَهَا وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

‘‘আর যদি তারা সন্ধির প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও তার প্রতি ঝুঁকে পড়, আর আল্লাহর উপর নির্ভর কর, নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’’[14] হুদাইবিয়ার সন্ধির ঘটনা কুরআন ও হাদীসের আলোকে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি যে, ইসলামী রাষ্ট্রের সংরক্ষণ, দাওয়াতের প্রসার ও দীনের বিজয়ে জিহাদের চেয়েও সন্ধির অবদান ছিল অনেক বেশি। জাগতিক বিচারে এ সন্ধি ছিল অপমানজনক, অবমাননাকর এবং কাফিরদেরকে সকল ছাড় দেওয়া। যে কোনো আবেগী বিচারে এ ছিল ‘‘সব কিছু মেনে নেওয়া’’। উমার (রা) ও অধিকাংশ সাহাবীই এরূপ ভেবেছেন। এ সময়ে মক্বাবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সকল অধিকার তাদের ছিল এবং যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সকল সুযোগ ও সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সন্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং কাফিরদের সকল দাবি মেনে নিয়ে সন্ধি করেছেন। আর ইসলামের কোনো জিহাদ, গাযওয়া, যুদ্ধ, অভিযান বা বিজয়কে ‘‘ফাতহ মুবীন’’ বা সুস্পষ্ট বিজয় বলা হয় নি। কিন্তু এ ‘‘সব কিছু মেনে নেওয়ার’’ সন্ধিকে কুরআনে ‘‘ফাতহ মুবীন’’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সন্ধি ও শান্তি রক্ষায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। এর একটি প্রকাশ হুদায়বিয়ার সন্ধি রক্ষার্থে নির্যাতিত মুসলিমদেরকে কাফিরদের হাতে ছেড়ে দেওয়া। এ ছিল এমন একটি সিদ্ধান্ত যা প্রায় সকল সাহাবীকে বিক্ষুদ্ধ করেছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ চুক্তি রক্ষায় অনড় ছিলেন। সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ে হুদাইবিয়ার ময়দানেই আবূ জানদাল (রা) নামক একজন নির্যাতিত মুসলিম শৃঙ্খলিত অবস্থাতেই মক্কা থেকে পালিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট এসে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শর্ত মেতাবেক তাকে মক্কাবাসীদের হাতে সমর্পন করেন। উপস্থিত সাহাবীগণ এ বিষয়ে খুবই আবেগী হয়ে উঠেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। এরপর আরেক নির্যাতিত মুসলিম আবূ বাসীর (রা) মক্কা থেকে পালিয়ে মদীনায় আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকেও ফিরিয়ে দেন। একপর্যায়ে আবূ বাসীর (রা), আবূ জানদাল (রা) ও আরো অনেক নির্যাতিত মুসলিম মক্কা থেকে পালিয়ে সিরিয়ার পথে ‘ঈস’ নামক স্থানে সমবেত হন। সন্ধিচুক্তির কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে মদীনার নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন নি। আর মদীনা রাষ্টের সাথে মক্কাবাসীদের সন্ধি থাকলেও এ নতুন জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের সন্ধি ছিল না; বরং তাদের মধ্যে পরিপূর্ণ যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছি। এ অবস্থায় তাঁরা সিরিয়াগামী কুরাইশ কাফিলাগুলির উপর আক্রমন চালাতে থাকেন। মক্কাবাসীরা বুঝতে পারে যে, এদেরকে মদীনা রাষ্টের নাগরিক মেনে সন্ধিচুক্তির অন্তর্ভুক্ত করাই তাদের জন্য নিরাপদ। তাদেরই অনুরোধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সন্ধিচুক্তির সংশি­ষ্ট শর্তটি বাতিল করে তাঁদেরকে মদীনায় আশ্রয় গ্রহণের ব্যবস্থা করেন।[15]

এভাবে সকল প্রকার আবেগ ও বেদনা নিয়ন্ত্রণ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সন্ধি ও শান্তি রক্ষার চেষ্টা করেছেন। যুদ্ধ বা হত্যা এড়িয়ে শান্তির লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইসলামে রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের ক্ষেত্রেও যুদ্ধ শুরুর পূর্বে শান্তির সুযোগ দানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শত্রুবাহিনীকে সন্ধি, আত্মসমর্পন, ইসলাম গ্রহণ, জিযিয়া বা কর প্রদান ইত্যাদির সুযোগ দিতে হবে। এছাড়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে, যুদ্ধ চলাকালে একেবারে অস্ত্রাঘাতের সময়ও যদি কোনো শত্রু সৈন্য নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করে তবে তাকে আর আঘাত করা যাবে না। বস্ত্তত একজন ডাক্তার যেমন সর্বাত্মক চেষ্টা করেন রোগীর অঙ্গচ্ছেদ না করে চিকিৎসা করারএকান্ত বাধ্য হলেই কেবল তার কোনো অঙ্গ কেটে প্রাণ বাচানোর চেষ্টা করেন; তেমনি ইসলামে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে প্রতিটি মানুষের প্রাণ রক্ষা করার।


(৪) কেবলমাত্র যোদ্ধা লক্ষ্যবস্ত্ততে আঘাত
কিতালের অন্য শর্ত, শুধু যারা যুদ্ধ করতে অস্ত্রধারণ করে সামনে এসেছে তাদেরই সাথে যুদ্ধ করতে হবে।

وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

‘‘তোমরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ কর তাদের সাথে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করছে। কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করবে না, আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না।’’[16] এ নির্দেশের মাধ্যমে ইসলাম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও যুদ্ধের নামে অযোদ্ধা লক্ষ্যবস্ত্ততে আঘাত করা, অযোদ্ধা মানুষদেরকে হত্যা করা ইত্যাদি সন্ত্রাসের পথ রোধ করেছে। যোদ্ধা ছাড়া কারো সাথে যুদ্ধ করা যাবে না এবং যুদ্ধের ক্ষেত্রেও সীমালঙ্ঘন, আগ্রাসন ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে হাদীসের নির্দেশ:


لا تغدروا ولا تمثلواولا تقتلوا وليداً ولا اصحاب الصوامع ... ولا راهبا ... ولا امرأةً ولا شيخاً كبيراً ... ولا تذبحوا بغيراً ولا بقرةً الا لمأكل ... ولا تخربوا عمراناً ولا تقطعوا شجرة الا لنفع ...وأحسنوا ان الله يحب المحسنين

‘‘যুদ্ধে তোমরা প্রতারণা বা ধোঁকার আশ্রয় নেবে না, চুক্তিভঙ্গ করবে না, কোনো মানুষ বা প্রাণীর মৃতদেহ বিকৃত করবে না বা অসম্মান করবে না, কোনো শিশু-কিশোরকে হত্যা করবে না, কোনো মহিলাকে হত্যা করবে না, কোনো গীর্জাবাসী, সন্ন্যাসী বা ধর্মযাজককে হত্যা করবে না, কোনো বৃদ্ধকে হত্যা করবে না, কোনো অসুস্থ মানুষকে হত্যা করবে না, কোনো বাড়িঘর ধ্বংস করবে না, খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া গরু, উট বা কোনো প্রাণী বধ করবে না, যুদ্ধের প্রয়োজন ছাড়া কোনো গাছ কাটবে না...। তোমরা দয়া ও কল্যাণ করবে, কারণ আল্লাহ দয়াকারী- কল্যাণকারীদেরকে ভালবাসেন।[17]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর জীবনের সকল যুদ্ধে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন যথাসম্ভব কম প্রাণহানি ঘটাতে। শুধু মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক ও যোদ্ধাদের জীবনই নয়, উপরন্তু তিনি শত্রুপক্ষের নাগরিক ও যোদ্ধাদেরও প্রাণহানি কমাতে চেয়েছেন। বস্ত্তত ইসলাম যুদ্ধকে যে মানবিক রূপ প্রদান করেছে তা অন্য কোনো ধর্মেই পাওয়া যায় না। উপর্যুক্ত শর্তাবলির বিদ্যমানতায় জিহাদ শরীয়ত সম্মত ইবাদতে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে জিহাদ আত্মরক্ষামূলক (defensive) হতে পারে। আবার তা আক্রমনাত্মক বা নিবৃত্তিমূলক (offensive/preemptive) হতে পারে। রাষ্ট্র প্রধান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

[1] কুরতুবী, আল-জামি’ লি আহকামিল কুরআন ৩/৫০/

[2] সূরা তাওবা, ৭৩ আয়াত, সূরা ফুরকান, ৫২ আয়াত, সূরা তাহরীম ৯ আয়াত। তাবারী, জামিউল বায়ান ১০/১৮৩। কুরতুবী, আল-জামি’ ১৩/৫৮।

[3] তিরমিযী, আস-সুনান ৪/৪৭১; আবু দাউদ, আস-সুনান ৪/১২৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৪/৫৫১।

[4] বুখারী, আস-সহীহ ২/৫৫৩, ৩/১০২৬।

[5] তিরমিযী, আস-সুনান ৪/১৬৫; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১১/২০৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৫৪।

[6] ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ৬/৩; যারকানী মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল বাকী (১১২২ হি.), শরহুল মুয়াত্তা ৩/৩; আযীমআবাদী, মুহাম্মাদ শামসুল হক্ক, আওনুল মা’বুদ ৭/১১১; মুনাবী, আব্দুর রাউফ (১০৩১ হি.), ফাইদুল কাদীর ২/৩০; সানআনী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল (৮৫২ হি.), সুবুলুস সালাম ৪/৪১; শাওকানী, মুহাম্মাদ ইবনু আলী (১২৫৫ হি.), নাইলুল আওতার ৮/২৫।

[7] বুখারী, আস-সহীহ ৪/১৪৮১-১৪৮২; মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৪২৫।

[8] বুখারী, আস-সহীহ ৩/১০৮০; মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৪৭১।

[9] বুখারী, আস-সহীহ ৪/১৬৪১; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/১৮৪, ৩১০।

[10] বুখারী, আস-সহীহ ৬/২৬৫৮; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৮৩০।

[11] ড. নাসির আল-আকল, আল-খাওারিজ, পৃ. ৪৭-৫৭।

[12] সূরা (২২) হজ্জ, আয়াত ৩৯।

[13] সূরা (৮) আনফাল: আয়াত ৭২।

[14] সূরা (৮) আনফাল: আয়াত ৬১।

[15] বুখারী, আস-সহীহ ২/৯৭৯; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৩/৩১১-৩১২।

[16] সূরা (২) বাকরা: আয়াত ১৯০।

[17] বাইহাকী, আহমাদ ইবনুল হুসাইন (৪৫৮ হি.), আস-সুনানুল কুবরা ৯/৯০।

নিঃসন্দেহে জিহাদের মাধ্যমে জীবন ও সম্পদ কুরবানী দেওয়া অত্যন্ত বড় ত্যাগ এবং মানবীয় প্রকৃতির জন্য খুবই কষ্টকর। এজন্য এ ইবাদতের সাওয়াব ও পুরস্কারও অভাবনীয়। কুরআন ও হাদীসে জিহাদের অফুরন্ত সাওয়াব ও পুরস্কারের কথা বলা হয়েছে এবং জিহাদের ইবাদত পালনের জন্য বিশেষ উৎসাহ ও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সকল আয়াত ও হাদীসের অর্থ জিহাদ যখন বৈধ বা শরীয়ত সম্মত হবে তখন যে ব্যক্তি মানবীয় দুর্বলতার ঊর্ধ্বে উঠে জিহাদের দায়িত্ব পালন করবে তখন সে এ অভাবনীয় পুরস্কার লাভ করবে। এছাড়া জিহাদের আবেগ ও আগ্রহ মুমিনের হৃদয়ে থাকবে। জিহাদের মাধ্যমে জীবন ও সম্পদের কুরবানীর প্রতি অনীহা ঈমানের দুর্বলতা প্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:


مَن مات ولم يَغزُ ، ولم يحدِّث به نفسَه ، مات علَى شُعبةٍ من نفاقٍ

‘‘যদি কেউ এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি এবং যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণের কোনো কথাও নিজের মনকে কখনো বলে নি, তবে সে ব্যক্তি মুনাফিকীর একটি শাখার উপর মৃত্যুবরণ করল।’’[1] আমরা দেখব যে, সাধারণভাবে জিহাদ ফরয কিফায়া এবং রাষ্ট্র শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে ফরয আইন। ফরয কিফায়া অবস্থায় যদি সকল মুসলিম তা পরিত্যাগ করে এবং ফরয আইন অবস্থায় যদি মুসলিমগণ তা পরিত্যাগ করে তবে তা তাদের জাগতিক লাঞ্ছনা বয়ে আনবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:


إذا تبًايعتم بًالعينة وأخذتم أذناب البقر ، ورضيتم بًالزرع ، وتركتم الجهاد سلط الله عليكم ذلا لا ينزعه حتى ترجعوا إلى دينكم

‘‘যখন তোমরা অবৈধ ব্যবসাবাণিজ্যে লিপ্ত হবে, গবাদিপশুরু লেজ ধারণ করবে, চাষাবাদেই তুষ্ট থাকবে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ পরিত্যাগ করবে তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দিবেন, দীনে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত যা তিনি অপসারণ করবেন না।’’[2] এ সকল আয়াত ও হাদীস থেকে অনেক সময় আবেগী মুমিন ভুল বুঝেন যে, জিহাদের বিষয়ে যেহেতু বেশি বেশি নির্দেশ ও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বেশি বেশি পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সেহেতু জিহাদ সালাত-সিয়ামের মতই ইবাদত অথবা সালাত সিয়ামের চেয়েও বড় ইবাদত। কারণ মহান আল্লাহ সালাত ও সিয়াম ফরয করেছেন এবং তিনিই জিহাদ ফরয করেছেন। আল্লাহ বলেছেন (كتب عليكم الصيام) তোমাদের উপর সিয়াম বিধিবদ্ধ করা হয়েছে’’[3] এবং তিনিই বলেছেন (كتب عليكم القتال) তোমাদের উপর কিতাল বা যুদ্ধ বিধিবদ্ধ করা হয়েছে’’।[4] কাজেই সালাত, সিয়াম ও জিহাদ-কিতালের মধ্যে পার্থক্য করলে বা সালাত পালন করে জিহাদ-কিতাল পালন না করলে ইসলাম পালন করা হবে না। আব্দুল্লাহ ইবনু উমারের সাথে খারিজীগণের কথোপকথনে আমরা এর নমুনা দেখেছি।

আমরা ইতোপূর্বে বলেছি যে, কুরআনে কোনো ইবাদতেরই বিস্তারিত বিধান ও শর্তাবলি উল্লেখ করা হয় নি। কুরআন ও সুন্নাতের সামগ্রিক নির্দেশনার আলোকে তা জানতে হয়। কুরআন ও সুন্নাতের আলোকে আমরা জানতে পারি যে, জিহাদ সালাত সিয়াম ইত্যাদির মত ‘ফরয আইন’ বা দীনের রুকন নয়, বরং তা ফরয কিফয়া ইবাদত। জিহাদের শর্তগুলি পূরণ সাপেক্ষ জিহাদ বৈধ বা ফরয হলে উম্মাতের কিছু সদস্য তা পালন করবেন। এতে উম্মাতের সকলের দায়িত্ব পালিত হয়ে যাবে। অন্যরা পাপমুক্ত হবেন, তবে এ ইবাদত পালনের সাওয়াব তারা পাবেন না। যারা এ ইবাদত পালন করবেন তারা এ ইবাদত পরিত্যাগকারীদের চেয়ে অধিক মর্যাদা লাভ করবেন, তবে পরিত্যাগকারীরা পাপী হবেন না। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন:

لَا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَىٰ ...

মুমিনদের মধ্যে যারা কোনো অসুবিধা না থাকা সত্ত্বেও (জিহাদ না করে) ঘরে বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর পথে নিজেদের প্রাণ ও সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা নিজেদের প্রাণ ও সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে যারা ঘরে বসে থাকে তাদের উপর মর্যাদা দিয়েছেন। উভয় প্রকারের মুমিনকেই আল্লাহ কল্যাণের (জান্নাতের) প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ....।’’[5] এখানে মহান আল্লাহ সুস্পষ্টতই জানিয়েছেন যে, কোনোরূপ ওজর ও অসুবিধা না থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ জিহাদ পরিত্যাগ করে তবে সে পাপী হবে না, শুধু অতিরিক্ত সাওয়াব ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হবে। এ অর্থে এক হাদীসে আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন,

أنَّ رجلًا أتى النبيَّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ فقال : أيُّ الناسِ أفضلُ ؟ فقال رجلٌ يجاهد في سبيلِ اللهِ بمالِه ونفسِه قال : ثم من ؟ قال مؤمنٌ في شِعبٍ من الشِّعابِ ، يعبدُ اللهَ ربَّه (وفي رواية: يقيم الصلاة ويؤتي الزكاة ويعبد ربه حتى يأتيه اليقين) ويدعُ الناسَ من شرِّه

‘‘একব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)এর নিকট আগমন করে বলে, হে আল্লাহর রাসূল, সর্বোত্তম মানুষ কে? তিনি বলেন: যে মুমিন নিজের জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। লোকটি বলে, এরপর সর্বোত্তম কে? তিনি বলেন: যে মুমিন মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী বিজন উপত্যাকায় থেকে তার প্রতিপালকের ইবাদত করে (দ্বিতীয় বর্ণনায়: এভাবে নির্জনে একাকী সে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, মৃত্যু আগমন পর্যন্ত তার প্রতিপালকের ইবাদত করে) এবং মানুষের কোনো ক্ষতি করে না।’’[6] এভাবে সমাজ ও জিহাদ পরিত্যাগ করে বিজনে নির্জনে একাকী বসবাস করে দীনের আরকান ও আহকাম পালনের কারণে দ্বিতীয় ব্যক্তি মর্যাদায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলেন, তবে পাপী বলে গণ্য হলেন না।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:


وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ

‘‘মুমিনদের জন্য সংগত নয় যে, তারা সকলে একসঙ্গে অভিযানে বের হবে। তাদের প্রতিটি দল থেকে একাংশ বের হয় না কেন? যাতে তারা দীনের জ্ঞানানুশীলন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে, যেন তারা সতর্ক হয়।’’[7] বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পিতামাতার খেদমত বা অনুরূপ দায়িত্বের কারণে জিহাদ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। এক হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা) বলেন:

جاءَ رجلٌ إلى النبيِّ صلى الله عليه وسلم فاستأذَنَهُ في الجهادِ فقالَ: أحيٌّ والداكَ ؟ قال: نعَم قال: ففيهِما فجاهِدْ (فارجع الى والديك فأحسن صحبتهما)

‘‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)এর কাছে এসে জিহাদে অংশগ্রহণের অনুমতি প্রার্থনা করে। তিনি বলেন: তোমার পিতামাতা কি জীবিত আছেন? সে বলে : হ্যাঁ। তখন তিনি বলেন : তোমার পিতামাতাকে নিয়ে তুমি জিহাদ কর। (অন্য বর্ণনায়: তাহলে তুমি তোমার পিতামাতার কাছে ফিরে যাও এবং সুন্দরভাবে তাঁদের খেদমন ও সাহচার্যে জীবন কাটাও।’’[8] এ সকল আয়াত ও হাদীসের আলোকে মুসলিম উম্মাহর প্রসিদ্ধ ফকীহগণ একমত যে, জিহাদ ফরয কিফায়া বা সামষ্টিক ফরয, কিছু মুসলিম তা পালন করলে অন্যদের ফরয আদায় হয়ে যায়। তবে যারা পালন করবেন তারাই শুধু সাওয়াব লাভ করবেন, অন্যরা গোনাহ থেকে মুক্ত হবেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে শত্রুবাহিনী যদি রাষ্ট্র দখল করে নেয়, বা রাষ্ট্র যদি বহির্শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়, সেনাবাহিনীর পক্ষে আগ্রাসন রোধ সম্ভব না হয়, এবং রাষ্ট্রপ্রধান সকল নাগরিককে যুদ্ধে অংশগ্রহণের নির্দেশ দেন তবে এ অবস্থায় জিহাদ ফরয আইনে পরিণত হয়। আল্লামা কুরতুবী বলেন:

الذي استقر عليه الإجماع أن الجهاد على كل امة محمد صلى الله عليه وسلم فرض كفاية فإذا قام به من قام من المسلمين سقط عن الباقين إلا أن ينزل العدو بساحة الإسلام فهو حينئذ فرض عين

‘‘ যে বিষয়ে ইজমা বা ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা হলো, উম্মাতে মুহাম্মাদীর সকলের উপর জিহাদ ফরয কিফায়া। যখন কিছু মানুষ তা পালন করবে তখন অন্য সকলের দায়িত্ব অপসারিত হবে। তবে যখন শত্রুগণ ইসলামী রাষ্ট্রে অবতরণ করে তখন তা ফরয আইন হয়ে যায়।’’[9] তাফসীর, হাদীস-ব্যাখ্যা ও ফিকহের প্রায় সকল গ্রন্থেই বিভিন্ন শব্দে ও বাক্যে এ কথাই বলা হয়েছে।

[1] মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৫১৭।

[2] আবু দাউদ, আস-সুনান ৩/২৭৪; আলবানী, সহীহাহ ১/১৫। হাদিসটি সহীহ।

[3] সূরা (২) বাকারা: ১৮৩ আয়াত।

[4] সূরা (২) বাকারা: ২১৬ আয়াত।

[5] সূরা (৪) নিসা: ৯৫ আয়াত।

[6] মুসলিম, আস-সহীহ ৩/১৫০৩।

[7] সূরা (৯) তাওবা: আয়াত ১২২।

[8] বুখারী, আস-সহীহ ৩/১০৯৪; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/১৯৭৫।

[9] কুরতুবী, মুহাম্মাদ ইবনু আহমদ (৬৭১ হি.), আল-জামি লি আহকামিল কুরআন ৩/৩৮।
৩. ৬. ৪. কাফির যোদ্ধা হত্যা বনাম কাফির হত্যা

কুরআনে যেমন কোথাও কোথাও কাফিরদের বা মুশরিকদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তেমনি অন্যত্র শুধু যুদ্ধরতদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন আমরা দেখেছি যে, আল্লাহ বলেছেন: ‘‘আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ কর তাদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করছে এবং সীমালঙ্ঘন করো না।’’ অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন:

بَرَاءَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى الَّذِينَ عَاهَدْتُمْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ غَيْرُ مُعْجِزِي اللَّهِ وَأَنَّ اللَّهَ مُخْزِي الْكَافِرِينَ وَأَذَانٌ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولُهُ فَإِنْ تُبْتُمْ فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ غَيْرُ مُعْجِزِي اللَّهِ وَبَشِّرِ الَّذِينَ كَفَرُوا بِعَذَابٍ أَلِيمٍ إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدْتُمْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ لَمْ يَنْقُصُوكُمْ شَيْئًا وَلَمْ يُظَاهِرُوا عَلَيْكُمْ أَحَدًا فَأَتِمُّوا إِلَيْهِمْ عَهْدَهُمْ إِلَىٰ مُدَّتِهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ وَإِنْ أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَا يَعْلَمُونَ كَيْفَ يَكُونُ لِلْمُشْرِكِينَ عَهْدٌ عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ رَسُولِهِ إِلَّا الَّذِينَ عَاهَدْتُمْ عِنْدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ فَمَا اسْتَقَامُوا لَكُمْ فَاسْتَقِيمُوا لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ

‘‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা মুশরিকদের মধ্য থেকে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে তাদের প্রতি। সুতরাং তোমরা যমীনে বিচরণ কর চার মাস, আর জেনে রাখ, তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না, আর নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদের অপদস্থকারী। আর মহান হজ্জের দিন মানুষের প্রতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে ঘোষণা, নিশ্চয় আল্লাহ মুশরিকদের থেকে দায়মুক্ত এবং তাঁর রাসূলও। অতএব যদি তোমরা তাওবা কর, তাহলে তা তোমাদের জন্য উত্তম। আর যদি তোমরা ফিরে যাও, তাহলে জেনে রাখ, তোমরা আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না। আর যারা কুফরী করেছে তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও। তবে মুশরিকদের মধ্য থেকে যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছ, অতঃপর তারা তোমাদের সাথে কোনো ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, তোমরা তাদেরকে দেওয়া চুক্তি তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ কর। নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালবাসেন। অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো (ঘোষিত ৪ মাস) অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর, তাদেরকে পাকড়াও কর, তাদেরকে অবরোধ কর এবং তাদের জন্য প্রতিটি ঘাটিতে বসে থাক। তবে যদি তারা তাওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয় তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম করুণাম। আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনে, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দাও। তা এজন্য যে তারা অজ্ঞ সম্প্রদায়। কীভাবে মুশরিকদের জন্য চুক্তি-অঙ্গীকার থাকবে আল্লাহর কাছে ও তাঁর রাসূলের কাছে? অবশ্য মসজিদে হারামের কাছে যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছ তাদের কথা আলাদা। যতক্ষণ তারা তোমাদের জন্য ঠিক থাকে, ততক্ষণ তোমরাও তাদের জন্য ঠিক থাক। নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালবাসেন।’’[1]

এখানে আল্লাহ বলেছেন: ‘‘যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো (ঘোষিত ৪ মাস) অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর ...’’ অনেক সময় অমুসলিম লেখকগণ এবং কখনো আবেগী মুজাহিদগণ কুরআনের অন্যান্য আয়াত বাদ দিয়ে এবং এ আয়াতগুলি আগের ও পরের বক্তব্য বাদ দিয়ে শুধু এ কথাগুলি উদ্ধৃত করে দাবি করেন যে, ইসলামে সকল কাফির বা অমুসলিমকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ অন্যান্য আয়াত বাদ দিলেও এখানের আয়াতগুলি খুবই স্পষ্ট। এখানে সুস্পষ্টতই বলা হয়েছে, যে সকল কাফির জনগোষ্ঠীর সাথে- তৎকালীন প্রেক্ষাপটে যে সকল কবীলা বা গ্রাম রাষ্টের সাথে- তোমাদের চুক্তি রয়েছে তাদের মধ্যে যারা চুক্তি ভঙ্গ করে নি তাদের চুক্তি বহাল থাকবে। আর যারা চুক্তি ভঙ্গ করেছে তাদেরকে তোমাদের পক্ষ থেকে চুক্তি বাতিল ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়ে চার মাসের সময় দাও। এ সময়ের মধ্যে তার যদি দীন গ্রহণ করে বা বশ্যতা গ্রহণ করে নিরাপত্তা প্রার্থনা করে তবে তাদেরকে নিরাপত্তা দিবে। অন্যান্যদের ক্ষেত্রে ঘোষিত চারমাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করবে। তাদের বাহিনীকে যেখানে পাওয়া যাবে আক্রমন করা হবে এবং হত্যা বা বন্দী করা হবে।

এখানে অযোদ্ধা মুশরিকদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয় নি। এ আয়াতের নির্দেশ পালনে কখনোই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অযোদ্ধা মুশরিকদেরকে পথে প্রান্তরে ধরে হত্যা করতে নির্দেশ দেন নি। এখানে মুশরিকগণ বলতে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হলো সে সকল চুক্তিভঙ্গকারী মুশরিক জনগোষ্ঠী বা কবীরা রাষ্ট্রের যোদ্ধাদেরকে বুঝানো হয়েছে। এখানে প্রথমে, শেষে ও মাঝে বারংবার চুক্তিরক্ষাকারীদের চুক্তি রক্ষা করতে ও নিরাপত্তাপ্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাকি সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতর্কিত বা গোপন আক্রমন না করে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে চার মাসের সময় দেওয়া হয়েছে।

এ ঘোষণার উদ্দেশ্য যথাসম্ভব বেশি জিহাদ করে বেশি মুশরিক হত্যা করা নয়, বরং এ ঘোষণার উদ্দেশ্য জিহাদের প্রয়োজনীয়তা সীমিত করা এবং যত বেশি সম্ভব মানুষকে বাঁচানো। আধুনিক যুগেও আগ্রহী অযোদ্ধাদের সুযোগ দেওয়ার জন্য বা যুদ্ধরত রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠীর মনোবল দুর্বল করে যুদ্ধ এড়ানোর জন্য এরূপ ঘোষণা দেওয়া হয়। যে কোনো আন্তর্জাতিক ও মানবিক বিচারে যুদ্ধের জন্য এর চেয়ে মানবিক ও যৌক্তিক ঘোষনা হতে পারে না। আমরা পরে দেখব যে, বাইবেলীয় জিহাদের ক্ষেত্রে এরূপ কোনো নৈতিকতা রক্ষা করা হয় নি; বরং যে কোনোভাবে প্রতারণার মাধ্যমে যত বেশি সম্ভব শত্রু হত্যাই সেখানে মূল লক্ষ্য বলে গণ্য করা হয়েছে।

এভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের প্রায়োগিক সুন্নাত থেকে আমরা নিশ্চিতরূপে বুঝতে পারি যে, কাফির-মুশরিককে হত্যার নির্দেশের অর্থ যুদ্ধের ময়দানে কাফির যোদ্ধা হত্যা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনোই বিচারে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বা যুদ্ধরত ‘কাফির’ ছাড়া অন্যদেরকে হত্যা করেন নি। তার রাষ্ট্রে অগণিত কাফির সকল নাগরিক অধিকার নিয়ে বসবাস করেছেন। তিনি কখনোই তাদের হত্যা করেন নি বা হত্যার অনুমতি দেন নি। ঈমানের দাবিদার মুনাফিকগণকে তিনি চিনতেন। তাদেরকেও হত্যার অনুমতি তিনি দেন নি। উপরন্তু তিনি অযোদ্ধা সাধারণ অমুসলিম নাগরিককে হত্যা কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: ‘‘যদি কোনো ব্যক্তি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিক বা অমুসলিম দেশের অমুসলিম
নাগরিককে হত্যা করে তবে সে জান্নাতের সুগন্ধও লাভ করতে পারবেন না, যদিও জান্নাতের সুগন্ধ ৪০ বৎসরের দুরত্ব থেকে লাভ করা যায়।’’

আমরা পূর্ববর্তী হাদীসে দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খারিজীদেরকে যখন যেখানে পাওয়া যায় হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ থেকে সাহাবীগণ কখনোই ঢালাওভাবে ‘‘খারিজী’’ মতাবলম্বীদের যেখানে পাওয়া যায় হত্যা করার অনুমতি বুঝেন নি। বরং এ থেকে তাঁরা যুদ্ধের ময়দানে খারিজী যোদ্ধাদেরকে হত্যার নির্দেশনা বুঝেছেন। খারিজীগণ অযোদ্ধা সাহাবী-তাবিয়ীগণ বা সাধারণ মুসলিমদের হত্যা করলেও সাহাবীগণ কখনোই যুদ্ধের ময়দান ছাড়া কোনোভাবে খারিজীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেন নি বা তাদেরকে হত্যা করেন নি। সমাজে তারা খারিজীদের সাথেএকত্রে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেছেন।[2]

[1] সূরা (৯) তাওবা: ১-৭ আয়াত।

[2] বিস্তারিত দেখুন, আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর, কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, পৃ. ৫৮২।
দেখানো হচ্ছেঃ থেকে ১০ পর্যন্ত, সর্বমোট ৫৪ টি রেকর্ডের মধ্য থেকে পাতা নাম্বারঃ 1 2 3 4 5 6 পরের পাতা »